চিপ প্যাট্রন ও চেয়ারম্যানের যৌথ নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ কী?

এরশাদ পতাœী বেগম রওশন এরশাদকে সংগঠনের চিপ প্যাট্রন করে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সাময়িকভাবে চাপা দেয়া হয়তো সম্ভব হবে কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সংগঠনটি অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল হিসাবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে সে নিয়ে এখনও কোনো আশাবাদ তৈরি হয়নি। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম বৈঠকে বৃহস্পতিবার দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে রওশন এরশাদের জন্য চিপ প্যাট্রন নামের নতুন পদ সৃষ্টির একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। চিপ প্যাট্রন পদের মর্যাদা পার্টি চেয়ারম্যানের উপরে রাখা হবে বলে বলা হচ্ছে। প্রেসিডিয়াম বৈঠকের আলোচনা অনুসারে জানা যায়, জাতীয় পার্টিতে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ জীবিত থাকাবস্থায় নিজে নিজেই দলের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তিনি সকালে এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিকালে আবার সেটি রদ করে ফেলতেন। এবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই একক কর্তৃত্বপরায়ণতার অবসান ঘটার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, যৌথভাবে এখন থেকে পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। শুক্রবার জাতীয় পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে পূর্ব ধারণা মোতাবেক জিএম কাদেরকে সভাপতি ও মশিউর রহমান রাঙ্গাকেই সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রাখা হয়েছে। ৮ বিভাগের জন্য নতুন করে ৮টি যুগ্ম মহাসচিবের পদ তৈরি হয়েছে এই সম্মেলনে। চিপ প্যাট্রন পদ সৃজনের পর এটিও আরেক বড় চমক। মূলত উত্তরাধিকারের রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে চর্চা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক চর্চার পথ রুদ্ধ করেছে সেখান থেকেই এত বিচিত্র সব পদ তৈরির বাস্তবতার উদ্ভব ঘটেছে।
হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের জীবতাবস্থাকালীন ও পরের জাতীয় পার্টির মৌলিক চরিত্র বদলানোটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এরশাদ নিজেকে জাতীয় পার্টির দ-মু-ের কর্তা মনে করতেন। দলে যারাই থেকেছেন তারা তার এই আধিপত্য মেনেই থেকেছেন। কিন্তু তার অন্তর্ধানের পর নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এখানে এরশাদের উত্তরাধিকার দাবিদার দুই জন। একজন এরশাদের সহোদর জিএম কাদের, অন্যজন এরশাদপতœী রওশন এরশাদ। জিএম কাদেরকে এরশাদ জীবিত থাকতেই পার্টির চেয়ারম্যান করে গেছেন। এরশাদের মৃত্যুর পর বেগম রওশন এরশাদ স্বভাবতই এই সিদ্ধান্ত মানেননি। তিনি কাদেরের নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। জিএম কাদের এখন চীপ প্যাট্রন পদ সৃজনের মাধ্যমে রওশনকে শান্ত করার প্রয়াস পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে যে চেয়ারম্যান ও চীপ প্যাট্রনের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হবে না তা পূর্বানুমানের বিষয় নয়। সময়ের ব্যবধানে এটি টের পাওয়া যাবে। তবে নানা বিষয় নিয়ে এরশাদের এই দুই উত্তরাধিকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব-মতভেদ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। এই দ্বৈত নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতীয় পার্টি জাতীয় রাজনীতির মূল ধারায় কতটা আবেদন তৈরি করতে পারে তাই এখন দেখার বিষয়।
এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি গঠিত হওয়ার ইতিহাসটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্টি গড়ে উঠেছিল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়। কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় দলটি গঠিত হয়নি। ফলে এই দলে যারাই এসেছেন তারাই কিছু পাওয়ার আমায় এখানে এসেছেন। দল যখন কিছু দিতে অপারগ হবে তখন স্বাভাবিকভাবেই এর ছাতার ছায়া থেকে অনেকেই সরে পড়বেন। ক্ষমতা হারানোর পর দল থেকে অনেক বাঘা বাঘা নেতাদের সরে যেতে দেখেছি আমরা। তাই বর্তমান জাতীয় পার্টি চেষ্টা করবে ক্ষমতাসীন দলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারায় অংশ বসাতে। এই জায়গায় দক্ষতার উপরই নির্ভর করবে দলের অবস্থা। তাই সামনের দিনগুলোতে কাদের-রওশন মিলে জাতীয় পার্টিকে এই জায়গায় কতটা সুবিধা এনে দিতে পারেন তার উপরই নির্ভর করবে অনেক কিছু।