চেক ডিজঅনার মামলা নিয়ে হাইকোর্টের তাৎপর্যপূর্ণ রায়

এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ আদায়ের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনার মামলা করতে পারবে না বলে একটি রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো: আশরাফুল কামালের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ রায় দেন। ঋণ আদায়ের জন্য এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্র্যাংক ব্যাংকের চেক ডিজঅনার মামলা বাতিল করে এ রায় দেয়া হয়। রায়টি একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায় হিসাবে বিবেচিত হবে। বিভিন্ন ব্যাংক বা অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এখন ঋণ দেয়ার সময় ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আগাম স্বাক্ষর করা খালি চেক নেয়া হয়ে থাকে। প্রচলিত দলিলপত্র ও ডকুমেন্টস এর অতিরিক্ত হিসাবে এই স্বাক্ষরিত খালি চেক গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কোনো কারণে গ্রাহক ঋণ পরিশোধে অসমর্থ হলে ব্যাংক অন্য সব পন্থা বাদ দিয়ে ওই চেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংক লিখে নগদায়নের জন্য ব্যাংকে পাঠায়। সংগত কারণেই হিসাবে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা না থাকার কারণে চেকগুলো ডিজঅনার হয়ে থাকে। তখন ওই ডিজঅনার হওয়া চেক দিয়ে ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে মামলা করে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে দায়েরি মামলায় বিভিন্ন জটিল হিসাব নিকাশের মাধ্যমে পাওনার পরিমাণ বেশি দাবি করারও অভিযোগ আছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো খাতকের ঋণ পরিশোধ না করার প্রকৃত কারণকে বিবেচনায় না নিয়ে এবং ঋণ আদায়ের জন্য সংগতিপূর্ণ অন্যবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সহজ পন্থা হিসাবে চেক ডিজঅনার মামলা করে থাকে। এই ধরনের আচরণ ঋণগ্রহীতার বাস্তব সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করে নিছক বেনিয়াবৃত্তির পরিচায়ক। তাই হাইকোর্ট আলোচ্য মামলার পর্যবেক্ষণে এই বলে মন্তব্য করেছেন যে, ‘ব্যাংকের হওয়ার কথা ছিল গরিবের বন্ধু, কিন্তু তা না হয়ে ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গরিবের রক্ত চুষছে। এটা হতে পারে না। নীলকর চাষিদের মতো, দাদন ব্যবসায়ীদের মতো যেনতেনভাবে ঋণ আদায় করাই তাদের লক্ষ্য’ (সূত্র: দৈনিক সমকাল, ২৪ নভেম্বর ২০২২)। আদালতের এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চলমান অন্যায্যতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হলো এখন ব্যক্তিপর্যায়ের দাদন ব্যবসায়ী সুদখোরদেরও এই আইনের আওতায় সুযোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়। সুদখোররা রাষ্ট্রের সকল বিধি বিধান অমান্য করে রক্তচোষার মতো উচ্চ সুদে টাকা দাদন করে থাকে এবং প্রচলিত আইনের সুফল নিজের পক্ষেও নিতে সমর্থ হয়। একটি আইন বা এর মাধ্যমে সৃজনকৃত নানা নির্দেশনা যখন সমাজের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত ব্যক্তি পর্যায়ের সুদখোর দাদন ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে তখন ওই আইন তৈরির উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈকি। আজকের মানবিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার সময়ে এরকম বিষয় নিয়ে নুতন করে চিন্তা করা দরকার।
ব্যাংক বা ব্যক্তি পর্যায়ের দাদন ব্যবসায়ীরা ঋণের জামানত হিসাবে চেক গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতারণামূলক কাজ করে থাকে বলে শুনা যায়। ঋণ গ্রহণের সময়েই তারা এই চেক নিয়ে থাকেন যা পরে নিজেরা লিখে ও টাকার অংক বসিয়ে ব্যাংকে উপস্থাপন করেন। কারও কাছ থেকে তারিখ ও টাকার অংক বিহীন চেক নেয়া কতোটা আইনসম্মত সেই প্রশ্ন উঠতে দেখি না আমরা। আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নীতিতে এই অন্যায্য ব্যবস্থার যথোপযুক্ত সংশোধন প্রয়োজন। কেউ ঋণ নিয়ে খেলাপী হলে ব্যাংকগুলোর অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করার সুযোগ আছে। হাইকোর্টের আলোচ্য রায়েও ঋণের টাকা আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করার বিষয়েই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের ওই তাৎপর্যপূর্ণ রায়ের আলোকে নেগোশিয়েবল এ্যাক্ট ১৮৮১ সহ যেসব জায়গায় মৌলিক পরিবর্তন দরকার আমাদের আইনজ্ঞরা তা চিন্তা করে দেখবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। একটি স্বাধীন দেশে যে আইন শোষণের ক্ষেত্রকে রক্ষা করার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ থাকে সেই আইনকে মানুষের স্বার্থে যুগোপযোগী করাই বাঞ্ছনীয়।