বিন্দু তালুকদার
২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তার অনুরোধে মাদক উৎপাদনের আস্তানা শাল্লা উপজেলার দুর্গম এলাকা হবিবপুর ইউনিয়নের চোরা বস্তি হিসাবে পরিচিত নারকিলা গ্রামে গিয়েছিলাম। ছোটকাল থেকে চোরাবস্তির নাম শুনেছিলাম। কিন্তু কখনও যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পেশাগত কারণে সংবাদ কভার করতে সেই চোরা বস্তিতে যাওয়া নিয়ে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
নারকিলা পৌঁছার আগেই আমাদের উপস্থিতির খবর চলে যায় সেখানে। দুপুরে যখন নারকিলায় পৌঁছি পুরো চোরা বস্তিতে নিরবতা তখন, কেউ নেই। গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখি চোরা বস্তির অধিকাংশ পরিবার হতদরিদ্র। অনেক খোঁজাখুঁিজ করেও মাদকের কোন সন্ধান পেলাম না। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সবাই মাটি খুঁড়ে প্রায় ৪০ ড্রাম চোলাই মদ উদ্ধার করলেন এবং ধ্বংস করলেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগের লোকজন যখন মদ নিয়ে ব্যস্ত। আমি উপস্থিত শিশুদের সাথে কথা বলে খোঁজতে থাকি গ্রামের কোন শিক্ষার্থী আছে কিনা। বিবস্ত্র ছোট্ট তিন শিশু পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় পাশের পাড়ার আব্দুর রহমানের বাড়ির সামনে। শিশুরা জানিয়ে দিল এই বাড়ির পাবেল মিয়া নামের একটা ছেলে হাইস্কুলে পড়ে।
বাড়ির সামনে পাওয়া গেল পাবেল আহমদের মা আমিনা বেগমকে। পাবেল বাড়িতে আছে কিতা জানতে চাইলে প্রথমে পুলিশের লোক ভেবে কিছুই বলতে চাইলেন না। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বললেন, একটু দাঁড়ান। পাবেল হাওর থেকে এখন বাড়িতে আসছে ভাত খেতে। ভাত খেয়েই দেখা করবে। তবে বেশি সময় কথা বলা যাবে না। কারণ সে অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে গেছে, দেরী করলে টাকা মার যাবে।
পাবেল আসার অপেক্ষা না করে তার মায়ের কাছে জানতে চাইলাম পাড়ার কতজন ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করে। তিনি বললেন,‘ স্যার এই গেরামের মানুষ পোলাপানরে পড়াইতে চায় না। আমরা অনেক কষ্ট কইরা পুলাডারে হাইস্কুলও পড়াইতাছি। হাই স্কুলও পরে, টেকা পয়সার অভাবে ভালা কইরা পড়াইতাম পারছি না। বই-খাতা, কলম কিনার লাগি মাইনষের বাড়ি কাম যায়।’
পরে পাবেলের সাথে মিনিট দশেক কথা বলে জানা যায়, গ্রামের এই পাড়ার লোকজন ছেলে মেয়ের শিক্ষার পরিবেশে বড় করতে আগ্রহী নয়। কেবল ব্যতিক্রম তার মা-বাবা। তারা চান পাবেলসহ তার সকল ভাই বোন লেখা-পড়া করে মানুষ হোক। কিন্তু দারিদ্রতার কষাঘাতে তার পরিবার জর্জরিত। তাই স্কুলের ফাঁকে ফাঁকে সেও অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। তবে লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে চায়। গ্রামের শত বছরের বদনাম গোছাতে চায় সে।’
পরদিন ১ জানুয়ারী ২০১৪ সালে পাবেলের শিক্ষা জীবন নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংবাদ প্রকাশিত হয় ‘পড়তে চায় নারকিলার পাবেল’। সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই পাবেলকে অর্থ সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন। একজন গাড়ি চালক পাবেলকে স্কুল ড্রেস তৈরি করে দেন। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের পক্ষ থেকে এক সেট বই দেয়া হয়। শহরের হোসেন বখত ফাউন্ডেশন ঘোষণা দিয়ে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত লেখা পড়ার ব্যয়ভার বহন করে। শাল্লা থানার তৎকালীন ওসি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস পাবেলের পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা করেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান পাবেল প্রতিকূল পরিবেশ উপেক্ষা করে উপজেলার সরষপুর গ্রামের শ্যামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন।
মঙ্গলবার বিকালে পাবেল ফোন করে সালাম দিয়ে বলল স্যার আগামীকাল বুধবার আমার পরীক্ষার রেজাল্ট, দোয়া কইরেন স্যার আমি যেন পাশ করতে পারি। বললাম পরীক্ষা ভাল হলে নিশ্চিয় পাশ করবে। গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটা আবারো ফোন বেজে উঠল। সালাম জানিয়ে চার শব্দের খুশির খবর ‘স্যার আমি পাশ করছি।’
পাবেল আহমদ শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের সেই চোরা বস্তি হিসাবে পরিচিত নারকিলা গ্রামের (একাংশ) প্রথম এসএসসি পাশ ও সর্বোচ্চ শিক্ষিত ছেলে। শ্যামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ৩.২৮ পেয়ে পাশ করেছে। তবে এসএসসি পাশ করলেও এইচএসসিতে সে ভর্তি হতে পারবে কিনা সেনিয়ে শংকা তার। কারণ তার পরিবারের এমন সামর্থ নেই। তাকে কোন কলেজে ভর্তি করবে। পাবেলের এই ফলাফলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিহার রঞ্জন চৌধুরী ও তার মা মোছা. আমেনা বেগম খুব খুশি।
বুধবার বিকালে মুঠোফোনে পাবেলের মা মোছা. আমেনা বেগম বলেন,‘ স্যার আমার পুত মেট্রিক পাশ করছে। আমরার গেরামও আমার পুতই প্রথম মেট্রিক পাশ। আমার পুতরে স্যার আমি কলেজও পড়াইতাম চাই। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ স্যার কিতা দিয়া পড়াইমু। পুতটা মেট্রিক পরীক্ষা দিয়াই খালি কইতাছে কলেজে পড়ত। স্যার কিতা দিয়া আমরা তারে পড়াইতাম। স্যার টেকপয়সার অভাবে পুতটা মনে অও আর পড়ত পারতনা।’
হুসেন বখত ফাউন্ডেশনের সভাপতি ইয়াকুব বখত বহলুল বলেন,‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ দেখে আমরা অবহেলিত নারকিলা গ্রামের পাবেলের লেখাপড়া যাতে নিয়মিত থাকে এজন্য তার পাশে থেকে সাধ্যমত সহযোগিতা করেছি। আমরা দোয়া করি ভবিষ্যতে সে যেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গ্রাম তথা এলাকার মুখ উজ্জ্বল করে।’
শ্যামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিহার রঞ্জন চৌধুরী বলেন,‘ নারকিলা গ্রামের দরিদ্র পরিবারের ছেলে পাবেল আহমদ প্রথম এসএসসি পাশ করেছে, এটা একটা বিরাট পাওনা। তার লেখা পড়ার কোন পরিবেশই ছিল না। তবুও সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আমরাও বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব সময় তাকে সহযোগিতা করেছি। আমি আর্শিবাদ করি সে যেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়।’


