বিজয় রায়, ছাতক
যাযাবর জনগোষ্ঠির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বেদে সম্প্রদায়ের লোকজনের কথা চলে আসে সর্বাগ্রে। উপজাতীরা অঞ্চল ভিত্তিক দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও বেদে সম্প্রদায়ের সিংহভাগ নারী-পুরুষই যাযাবর জীবন-যাপনে অভ্যস্থ। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচরণ করে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে সাচ্ছন্ধ্যে। স্থায়ীভাবে বসবাস করা বেদে সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে অনেকেরই অপছন্দ। ঢাকার সাভার এলাকা থেকে প্রায় ৮৫ বছর পূর্বে আসা ছাতকের নোয়ারাই ইউনিয়নের ফকির টিলা এলাকায় স্থায়ী বসবাস করা বেদে সম্প্রাদায়ের বর্তমান জীবন-জিবীকা তুলে ধরা হচ্ছে পাঠকদের জন্য। বেদে সম্প্রদায়ের আদি নিবাস ঢাকার সাভার অঞ্চলে। জন্মগতভাবেই দলভুক্ত হয়ে বসবাস করা এ সম্প্রদায়ের লোকজনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট। উপার্জন ক্ষেত্রে নারী নির্ভশীল বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন দেশের অঞ্চলে-অঞ্চলে ঘুরে তাদের জীবন যাত্রা পরিচালনা করে থাকে। তবে সর্ব ক্ষেত্রে ডাঙ্গার চেয়ে নৌকায় বসবাস করতে তারা অনেক বেশী স্বাচ্ছন্ধ্যবোধ করে। সাভার ছেড়ে প্রায় ৮৫ বছর আগে এ অঞ্চলে আসে বেদে সম্প্রদায়ের একটি দল। প্রথমত তাদের বৈশিষ্ট অনুযায়ি নৌকাতে থেকেই জীবন যাত্রা শুরু করেছিল। দেশের সীমান্ত অঞ্চল ও পাহাড়-টিলা বেষ্টিত সুবজ বৃক্ষরাজি অঞ্চল হওয়ার সুবাধে ও তাদের পেশাগত অনুকুল পরিবেশ হওয়ায় ছাতকের ফকিরঠিলা এলাকায় স্থায়িভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। মুলতঃ তখন থেকেই যাযাবরের জীবন ত্যাগ বেদে সম্প্রদায়ের এ দলটি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেেত শুরু করে। নোয়ারাই ইউনিয়নের ফকিরটিলা এলাকায় চেলা নদীর তীরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে ১৯৪০ সালে প্রথমদিকে। মাত্র ৭-৮টি পরিবারের সমন্বয়ে সৃষ্ট পল্লী তখন থেকেই নামকরন করা হয় বেদে পল্লী। বর্তমানে ৮০-৯০টি পরিবার এ পল্লীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। জনমুখে বেদে পল্লী নামে পরিচিত হলেও বেদে সম্প্রায়ের লোকজন তাদের এ পল্লীকে ফকিরটিলা চৌধুরীপাড়া হিসেবে পরিচিতি দিয়ে থাকে।
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এখানের বেদে পল্লীর বাসিন্দারা সম্প্রদায় ভিত্তিক পেশাতেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। পুরুষ ও নারীরা পৃথক পেশায় প্রতিদিন ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়ে। ঝাড়-ফুক, শিঙ্গা লাগানো ও তাবিজ-কবজ বিক্রি করা বেঁদেনীদের প্রধান পেশা। সাপ ধরা, সাপের খেলা দেখানো ও তাবিজ-কবজ বিক্রি করা সম্প্রদায়ের পুরুষদের পেশা। সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট অনুসরণ করেই চলে এখানের বেদেদের সংসার। বর্তমানে তাবিজ-কবজে মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলায় অন্য পেশায়ও ঝুকে পড়ছে তারা। ধর্মীয় উপাসনা পালন করার জন্য বেদে পলীতে তারা আর্থিক সহায়তা নিয়ে নির্মান করেছে একটি মসজিদ। পল্লীর বাসিন্দাদের নিয়ন্ত্রন রাখতে তাদের মধ্যে এখনো প্রচলিত রয়েছে সর্দার প্রথা। ফকিরটিলা বেদে পলীর ২জন সর্দার এখানের শতাধিক পরিবারের চার শতাধিক বাসিন্দাকে নিয়ন্ত্রন করে থাকেন। মুসলিম নিয়মে সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেও তাদের বিয়ের আনুষ্ঠাকিতা ভিন্ন। জাতি বৈষ্যমের কারনে এখানের বেদে সম্প্রাদায়ের শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। আধুনিকতার এতটুকু ছোঁয়া লাগেনি এ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে। তথ্য-প্রযুক্তির ডিজিটাল বাংলাদেশে সাথে তারা খুবই অপরিচিত। প্রচলিত, আধুনিক ও প্রযুক্তিগত-কোন শিক্ষাই তারা এখনো স্পর্শ করতে পারেনি। দেশের নাগরীক হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অধিকার থাকলেও নাগরিক সুবিধা ভোগ করার অধিকার যেন তাদের নেই। অন্যান্য মানুষের মতো সামাজিক মর্যাদায় জীবন-যাপন করা তাদের খুবই ইচ্ছে। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য তাদের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাড়িঁয়েছে। যে কারনে শত প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে সম্প্রদায় ভিত্তিক পেশার উপর ভর করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে তারা। হাটতে পারা শিশুদের দিয়েও তারা সাপ খেলা দেখানোর মতো ঝুঁকি কাজ প্রশিক্ষন দিয়ে থাকে। যাতে শিশুরা বড় হয়ে জাতিগত পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। সম্প্রতি কোন এক ঘটনা চক্রে এখানের বেদে পল্লীর দিকে নজর পড়ে সুনামগঞ্জ জেলা ও ছাতক উপজেলা পরিষদ এবং প্রশাসনের। সুনাগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম, ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান, সহকারী কমিশনার(ভুমি) শেখ হাফিজুর রহমানসহ কর্মকর্তারা বেদেদের আমন্ত্রনে গিয়ে ছিলেন বেদে পল্লীতে। তাদের আচার-অনুষ্ঠান দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছেন, তেমন তাদের মানবেতর জীবন-যাপন দেখে জেলা প্রশাসকসহ অতিথিরা মর্মাহতও হয়েছেন। এ সময় বেদে সম্প্রদায়ের কল্যাণে সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। বর্তমানে স্থায়ী বসবাস ছাড়াও পল্লীর চেলা ঘাটে নৌকায় ভাসমান অবস্থায়ও বসবাস করছে এখানের বেদে সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার। বেঁদে সর্দার আব্দুল্লাহ মিয়া জানান, তারা বেঁদে বলে তাদের স্ত্রী-সন্তানরা অন্যান্য সমাজের মানুষের সাথে মিশতে পারে না। অবহেলা ও তুচ্ছ-তাচ্ছুল্য করা হয় তাদের। বঞ্চিত বেদে শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে তাদের পল্লীতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবী জানান তিনি। বেঁদে সর্দার কফিল মিয়া জানান, তারা পূর্ব পুরুষদের পথ অনুসরণ করে সাপ খেলা, সাপ ধরা ও তাবিজ-কবজের উপর ভর করে বেঁচে আছেন। কিন্তু কালের প্রভাবে এসবে মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাই বাধ্য হয়েই অন্যান্য পেশায় ঝুকে পড়ছে বেদেরা। সর্পরাজ বুরহান উদ্দিন জালালী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নির্বাচন এলেই ভোটের জন্য তাদের কদর বেড়ে যায়। তখন বেদে সম্প্রদায়ের উন্নয়নে প্রার্থীরা দিয়ে থাকেন বিভিন্ন প্রতিশ্র“তি। বাস্তবে বেদেরা অবহেলায় ছিল এখনো অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। বেদে কন্যা গোলাপী জানায়, বিপদে পইড়লে বাইদ্যার দরকার হয়। বিপদ ফুরিলে আর বাইদা চেনে না। যুবারা বাইদা মাইয়াদের দিহে কেমন কইরা চাইয়া থাকে। শিঙ্গা লাগাইয়া টাহা দিতে চায় না। গোলাপীরা সাধারন মানুষের মতো জীবন-যাপন করতে চায়।
বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন এ দেশের নাগরিক হিসেবে সকল সুবিধা ভোগ করা তাদের নাগরিক অধিকার। এখানের বেদে পল্লীর শিশুরা লেখাপড়া করতে না পারলে দেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে। সম্প্রদায় বিবেচনা না করে সব শিশুর জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সকলের দায়িত্ব।
উদ্ধার


