ছাত্র রাজনীতিতে এমন মেধা চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হোক

একটি অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রংপুর জেলা ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব পেতে আগ্রহীদের জন্য ৫০ নম্বরের ৩০ মিনিটের একটি লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করেছেন তাঁরা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা বই থেকে প্রশ্ন তৈরি করে এই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। এ প্রসঙ্গে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি গণমাধ্যমকে বলেছেনÑ‘অনেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও জীবন সম্পর্কে জানেন না। পরীক্ষার মাধ্যমে তারা সম্যক ধারণা পাবেন। এ উদ্যোগে নতুন অধ্যায় শুরু হলো’। (দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর ২০২২)। রংপুর জেলা ছাত্র লীগের এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিশেষ করে যখন ছাত্র নেতৃত্ব মেধা ও মননশীলতা চর্চার জায়গা থেকে অনেক দূর সরে গিয়ে বিত্ত ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অধিক মনোযোগী হয়ে পড়েছেন তখন এই উদ্যোগ নেতৃত্বকে আবারও মননশীলতা চর্চার দিকে কিছুটা হলেও ধাবিত করতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এই ধরনের চর্চার সাথে ছাত্র নেতৃত্বকে শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষাবান্ধব নানা বিষয়ে মনোযোগী হতে সারা দেশে পরিকল্পনামাফিক ব্যাপকভাবে কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান আমাদের।
এখনকার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন পদাধিকারীগণ নিজ নিজ সংগঠনের আদর্শ উদ্দেশ্য, ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র, সংগঠন ও ছাত্র রাজনীতির অতীত ইতিহাস, দেশের রাজনৈতিক চর্চার গৌরবময় কথা প্রভৃতি সম্পর্কে খুব বেশি জানেন বলে আমাদের মনে হয় না। হবে কীভাবে? সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক চর্চা এখন নেই বললেই চলে। এ কথা সকল সংগঠনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিভিন্ন জাতীয় দিবসসহ অন্যান্য দ্রষ্টব্য দিবসে এসব সংগঠনের স্বতন্ত্র কোনো কর্মসূচি এখন দেখা যায় না। দেশের শিক্ষা ও ছাত্র সমস্যা নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর কোনো আগ্রহ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো ছাত্র সংগঠন এখন আর দাবি করে না। এক ধরনের হতাশাজনক স্থবিরতা ছাত্র রাজনীতিকে গ্রাস করে রেখেছে। ছাত্র সংগঠনের জন্য উপযুক্ত রাজনীতি ও সাংগঠনিক চর্চার বদলে এখন মূল দলের কারও না কারও স্তাবকতায় নিয়োজিত থাকার দৃশ্য আমরা দেখতে পাই। এর বাইরে অনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন তারা। এরকম অবস্থায় ছাত্র নেতৃত্ব যে মেধা চর্চার জায়গা থেকে অনেক দূরে সরে যাবেন তাতে আর আশ্চর্য কী।
ছাত্র রাজনীতির এই দুর্বলতার কারণে দেশে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে পারছে না। রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা ও বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে। নেতৃত্ব হলো একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। হঠাৎ মাটি ফঁুড়ে এসে জনগণের নেতা হওয়া যায় না। নেতৃত্বসুলভ গুণ গড়ে উঠে না দীর্ঘ চর্চার মধ্যে না থাকলে। একসময় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনে রাজনৈতিক ক্লাস নেয়া হত নিয়মিত। এখনও কিছু কিছু সংগঠন এইসব কাজ করে। তবে মূল ধারার সংগঠনগুলো এইসব চর্চার ধার ধারে না। কারণ নেতৃত্ব পেতে নেতৃত্বসুলভ গুণের চাইতেও দাপট দেখানোর ক্ষমতা ও আনুগত্যকে এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসাবে গণ্য করা হয়। এই মনোভাব ছাত্র রাজনীতিকে আজ নখদন্তহীন করে ফেলেছে। দেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিসংগ্রাম, এমনকি নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির যে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিলো; এখন সেরকম অবস্থা নেই। এর কুফল পড়েছে জাতীয় রাজনীতিতে। মূল রাজনীতিকে আমরা যে গণমুখী চরিত্রে দেখতে চাই তার নিশ্চয়তা চাইলে অবশ্যই নেতৃত্ব তৈরির আতুড়ঘর ছাত্র রাজনীতিকে শক্তিশালী ও লক্ষাভিমুখী করতে হবে। এই জায়গায় রংপুর জেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। কামনা করি এই ধারা সারা দেশে আবারও ছড়িয়ে পড়বে এবং আমাদের প্রত্যাশার ছাত্র নেতৃত্ব মেধা ও মননসহ সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে একসময় তাঁদের একটি অংশ জাতীয় নেতৃত্বের ভার গ্রহণে সমর্থ হবে।