সদ্য সমাপ্ত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় এক ছাত্রকে নকলে বাধা দেয়ার কারণে বাধাদানকারী শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করেছে সেই নকলবাজ ছাত্র। ঘটনাটি জামালগঞ্জ উপজেলার। গত ১৬ নভেম্বর জামালগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী জনৈক রিয়াজ মাহমুদ শাহকে নকল করায় বাধা দিয়েছিলেন পরীক্ষা কক্ষের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক সীতেশ কুমার সরকার। ওই ঘটনার জেরে রিয়াজ মঙ্গলবার বিকেলে জামালগঞ্জ হেলিপ্যাড এলাকার রাস্তায় শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করেছে। নকলে বাধাদানকারী শিক্ষক এখন জামালগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসক বলেছেন, তাঁর ঘাড়ের নীচে ও ডান হাতে দুইটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সাবাস ছাত্র বটে ওই রিয়াজ মাহমুদ। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই সে নিরীহ শিক্ষককে পিটিয়ে হাত পাকা করে নেয়ার সুযোগ পেল। সে বড় হয়ে নিশ্চয়ই অন্যকে পিটানোয় আরও ওস্তাদি দেখাতে সক্ষম হবে। প্রশ্ন হলো, রিয়াজের এই ‘বীরত্বে’ আমরা খুশি হব নাকি লজ্জায় মাথা অবনত করব? সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবক্ষয়ের ক্ষত থেকে যে পূঁজ বেরিয়ে আসা শুরু করেছে সেখানে এই ঘটনাটিকে আমরা খুব বেশি বিস্ময়কর বলতে পারি না। নৈতিকতাভ্রষ্ট জায়গা থেকে রিয়াজের মতো শিক্ষক পিটানো ছেলে হওয়াটাও আশ্চর্যের কিছু নয়। তবে কথা হলো এইরকম বাস্তবতা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই, কখনও একজন ছাত্র তার শিক্ষকের গায়ে হাত তুলার মতো ধৃষ্টতা দেখাবে, সেটি কেউই চিন্তা করতে চান না।
নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তাঁর নানামুখী তৎপরতায় নকলপ্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। তবে কিছু যে রয়ে গেছে তার জ্বলজ্ব্যন্ত প্রমাণ তো জামালগঞ্জের এই ঘটনাটিই। পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্বই হলো নকল প্রবণতাকে রোধ করা। এই কর্তব্য পালন করতে যেয়ে কেউ হেনস্তা বা নির্যাতনের শিকার হলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধীকে শায়েস্তা করতে হবে। নতুবা বেয়াদব ছাত্রদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। নকলপ্রবণতাকেও প্রতিহত করা সম্ভবপর হবে না। এরকম ঘটনার বিচার না হলে এটি দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়ে যাবে যা মন্দ শিক্ষার্থীদের সাহস বাড়িয়ে দিবে। কিন্তু প্রত্যাশিত সেই বিচার কি আদৌ পাওয়া যাবে? আমরা দেখেছি, কয়েক দশক আগে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে নকল ধরার কারণে নকলবাজ ছাত্রের হাতে নিহত শিক্ষক রঞ্জু বাবুর হত্যাকা-ের বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না হতে। অপরাপর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি। এমন অবস্থায় জামালগঞ্জের এই শিক্ষক নিপীড়নের ঘটনাটিও চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম নয়। তবে শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ তথা সুশিক্ষা দানের জায়গা থেকে আমরা প্রত্যাশা করি এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে।
অন্যদিকে কোন ধরনের পরিবেশ আমাদের শিশুদেরকে এমন প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণ হিং¯্রতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে সেটি অনুসন্ধান করে সেই জায়গা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব তার পথ অনুসন্ধানেও মনোযোগী হতে হবে আমাদেরকে। আমরা জানি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এখন আর আগের মতো আত্মিক নয়। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটিকেও তাই আগ্রাসী জায়গা থেকে ফিরিয়ে আনা সমান জরুরি।

