নলজুর নদ খনন নিয়ে জগন্নাথপুরের সচেতন নাগরিক সমাজের ক্ষোভ বেড়েছে। গত মঙ্গলবার উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত জগন্নাথপুরের বিশিষ্ট নাগরিকরা নদ খননে নানা অভিযোগের কথা তোলে ধরেন। বক্তারা অপরিকল্পিতভাবে নদ খননের অভিযোগ এনেছেন। নদের আগের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার বদলে খননের নামে খালের মত সরু নালা খনন করা হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। একসময় নলজুর নদ দিয়ে লঞ্চ, স্টিমার ও বড় নৌযান চলাচল করত। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদটি পূর্বের জৌলুষ হারিয়েছে।
বাংলাদেশের সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। দেশের অধিকাংশ হাট-বাজার যেকোন নদীর পাড়ে স্থাপিত দেখতে পাওয়া যায়। নদীপথের সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা ও সারা দেশব্যাপী জলপথের বিস্তৃতিই এর কারণ। এছাড়া আমাদের কৃষি, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জলবায়ুর জন্য নদী এক অপরিহার্য সত্তা। সুজলা নদীগুলোই আমাদের ফসলের মাঠকে সুফলা করে রেখেছে। তাই নদী আমাদের প্রাণস্বরূপ। কিন্তু আমাদেরই কিছু অবিবেচক কর্মকা- মাতৃস্বরূপা নদ-নদীগুলোকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। একদা প্রমত্তা নদীগুলো আজ শীর্ণকায়া হতে হতে তার অস্তিত্ব হারিয়েছে। যেখানে নদী ছিল সেখানে এখন পায়ে চলার সড়ক হয়ে গেছে। নদ-নদীকে এমন অপমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে আমরা মূলত নিজেদের হাজার বছরের সনাতন ও সমৃদ্ধ সভ্যতাকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছি। প্রাকৃতিক কারণে নদীতে পলি জমে। তল ভরাট হয়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে খনন কাজ পরিচালনা করলে সবগুলো নদীর নব্যতাই বজায় রাখা সম্ভব। কিন্তু আমরা তা করছি না। অন্যদিকে নদীকে দূষিত করতে যত কাজ আছে সবই আমরা করে চলেছি অবলীলায়। দুনিয়ার যত আবর্জনা তার সবই আমরা শেষ পর্যন্ত নদীতে এসে ফেলি। যেন নদীই যাবতীয় ময়লার ভাগার। হাট-বাজারে প্রচুর প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিদিন তৈরি হয়। এগুলো কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এভাবে নদী দূষণের কাজ আমরা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। আইন মোতাবেক নদীকে জীবন্ত সত্তা আখ্যায়িত করলেও আমাদের নাগরিক চাল-চলনে এর বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যায় না। নদীকে ধ্বংস করার এমন বহুবিস্তৃত কর্মকা- রোধ করতেও সরকারিভাবে তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না।
এখন সরকাািরভাবে নদী খননের নামে যা করা হয় তা মূলত টাকার লুটপাট ছাড়া আর কিছু নয়। কোন সমীক্ষা বা বৈজ্ঞানিক তথ্য-বিশ্লেষণের তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছভাবে নদী খননের নামে রীতিমত তামাশা করা হয়। বিআইডব্লিউটিএ যেসব নদীর খনন করে সে সম্পর্কে স্থানীয় লোকজন বা প্রশাসন কিছু জানে না। ফলে ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছামাফিক কাজ করেন। খননের যে প্রাক্কলন থাকে তাকে উপেক্ষা করেন ঠিকাদাররা। আবার ভুল নকশা প্রণয়নের অভিযোগও উঠে। মূলত নদী খননে স্থানীয় সম্পৃক্ততার অভাবে এটি একটি বেপরোয়া কর্মকা-ে পরিণত হয়েছে। নলজুর নদী খননের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নেশন টেক লিমিটেড খনন কাজ সমাপ্ত না করেই চলে যায় বলে গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায়। প্রথম যে কাজ ৫ কোটি টাকায় করার জন্য ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই কাজ সমাপ্ত না হওয়ায় এখন সরকারের বাড়তি প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে গেছে। অথচ কাজ না করার কারণে ঠিকাদারকে কোন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। এ ধরনের অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
জগন্নাথপুরের নলজুর নদ খননের কাজটি যথাযথ নকশা অনুসরণ করে এমনভাবে করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই যাতে নদটি আগের মত নাব্যতা ফিরে পায় এবং জগন্নাথপুরের অর্থনীতি, উৎপাদন, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রাণময় সত্তা হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
- তাহিরপুরে আন্তঃপ্রজন্মীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত
- নোয়াগাঁওয়ে হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করলেন গ্রামবাসী

