জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর এবার- আফালের ঢেউ ভাঙ্গছে বাড়ি

অমিত দেব  ও আলী আহমদ
‘ধান গেল পানির তলে ডুইব্যা হাওরের হকল মাছ গেল মইর‌্যা আর এখন আফালের ঢেউ নিয়ে যাচ্ছে ঘর বাড়ি ভাইংগ্যা কিতা কইরা বাঁচমু এইবার বুঝরাম না কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরপাড়ের ভূরাখালি গ্রামের বাসিন্দা  নুরুল হক (বথাই)। শুধু নুরুল হক বথাই মিয়াই নন নলুয়ার হাওরপাড়ের বিভিন্ন গ্রামের মানুষদেরকে এখন ঘরবাড়ি নিয়ে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে আফালের ঢেউয়ের সঙ্গে। হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে হাওরের আফালের ঢেউ থেকে বাড়ি ঘর রক্ষায় প্রতিটি বাড়ির মালিক নিজের বাড়ি সুরক্ষার জন্য গাছপালা ও বাঁশ বস্তা দিয়ে হাড়গড় তৈরি করে প্রটেকশন দেয়ালের ব্যবস্থা করেন। ধনী শ্রেণির মানুষরা আফালের কবল থেকে বাড়ি ঘর রক্ষায় বাউন্ডারি গার্ডওয়াল দিয়েছেন। কিন্তুু হাওর এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর গ্রামগুলোতে এ সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। অধিকাংশ গৃহস্থরাই প্রতি বছর নিজেরা আফালের ঢেউ থেকে বাড়ি ঘর রক্ষায় হাড়গড় দিয়ে থাকেন। এবার না দিতে পারায় গ্রামবাসী বিপাকে পড়েছেন।
চিলাউড়া- হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশ মিয়া জানান, নলুয়ার হাওরপাড়ের ১৫ গ্রামের মানুষ প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বিশেষ করে বৈশাখী ধান গোলায় তুলে বাড়ি ঘর হাড়গড় দিয়ে থাকেন। এবার আকস্মিক বন্যা আসায় কোন গৃহস্থই এই সুযোগ পাননি। তাই অধিকাংশ বাড়িঘর আফালের ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। তিনি জানান, আমার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে আফালের ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির তালিকা তৈরী করেছে। ইতিমধ্যে ২০ জনের একটি তালিকা প্রশাসনের নিকট জমা দিয়েছি।
ভূরাখালি গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাফিজ বলেন, প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ জীবদ্দশায় হাওরপাড়ের মানুষের কথা চিন্তা করে প্রটেকশন দেয়ালের একটি পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু সময়স্বল্পতায় তা তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, আমরা করচ গাছ লাগিয়ে গ্রামকে কিছুটা রক্ষা করলেও বাড়ি ঘর রক্ষায় প্রতি বছর নিজ নিজ বাড়ির পেছনে হাড়গর দিতে হয়। এবার সেই সুযোগ না থাকায় ভাঙ্গনের কবলে পড়েছেন গ্রামবাসী। তিনি জানান, আফালের ঢেউয়ের শা শা শব্দে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়,ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে গ্রাম রয়েছে ১৫টি টি। প্রতিটি গ্রাম নলুয়ার হাওরবেষ্টিত। তাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন এটি। ইতিমধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারীভাবে ১৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা হাওর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, হাওরপাড়ের প্রায় সব পরিবারই আফালের ঢেউ থেকে বাড়ি ঘর রক্ষায় প্রটেকশনের কাজ করতে পারেননি। তাই অধিকাংশ বাড়ি ঘর ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। বিশেষ করে ভূরাখালি,দাসনোওয়াগাঁও গ্রামবাসী খুববেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের বেরি গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক ফররুখ আহমদ বলেন, হাজার মণ ধান পাওয়া কৃষকও এবার বিপাকে পড়েছেন। তারা না পারছেন লাইনে গিয়ে চাল কিংবা ত্রাণ আনতে না পারছেন কাউকে কিছু বলতে। ওই শ্রেণীর মানুষদেরকে সহায়তা করতে হবে। তিনি বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়ন করে তাদেরকে পুর্নবাসন না করলে কৃষকরা কৃষি কাজ ছেড়ে দিবে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, জগন্নাথপুরের হাওরপাড়ের মানুষ ধান,মাছ হারিয়ে এখন  আফালের ঢেউয়ে বাড়ি ঘর নিয়ে শংকায় রয়েছেন। তাদের জন্য টিন,নগদ টাকাসহ সরকারী সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।