জগন্নাথপুরের পরিবেশ বিপর্যয় হাওরবাসীর দুর্বিষহ জীবনযাপন

অমিত দেব, জগন্নাথপুর
মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়ছেন জগন্নাথপুরের হাওর পাড়ের মানুষ। অতিবিষ্টি ও অকাল বন্যায় একমাত্র বোরো ফসল হারানোর পর অ্যামোনিয়া গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে বিষক্রিয়ায় হাওরের মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এসব মাছ খেয়ে হাওর অঞ্চলের মানুষ নানা রোগবালাইয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এছাড়াও পঁচা ধান পানি দূষণ ও মরা মাছের  দুর্গন্ধে মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়েছেন হাওরবাসী। দরজা বন্ধ করে ছেলে মেয়ে নিয়ে ঘরে টিকতে পারছেন না নলুয়ার হাওর বেষ্টিত ১৫ গ্রামের মানুষ।
সুনামগঞ্জের অন্যতম বৃহৎ হাওর জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর ঘুরে হাওর অঞ্চলের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চৈত্র মাসে আকস্মিক অতিবৃষ্টি ও অকাল বন্যায় জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরসহ ছোটবড় ১৫টি হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর কৃষক পরিবারে হাহাকার দেখা দেয়। কৃষকদের আশা ছিল হাওরের মাছ ধরে হয়তো তাদের জীবিকা নির্বাহ হতে পারে। কিন্তু  নতুন বছরের প্রথম দিনেই কাল বৈশাখী ঝড় হাওরবাসীর সেই স্বপ্নও ভেঙ্গে দিয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলার  হাওর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন,একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভর নলুয়ার হাওরের ১৫ গ্রামের কৃষক। ফসল গেলে কৃষকরা হাওরের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। এবার হাওরের সব মাছ মরে যাওয়ায় হাওর অঞ্চলের মানুষ কীভাবে  খেয়ে বাঁচবেন চিন্তায় আছেন। এছাড়াও পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হওয়ায় হাওরপাড়ের মানুষ বিপাকে পড়েছেন। সিদ্দিকসহ এলাকার অনেকেই জানান, নলুয়ার হাওর বেষ্টিত কমপক্ষে ১৫টি গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবার হাওরের ধান ও মাছ পঁচা দুর্গন্ধে ঘরে টিকতে পারছেন না।
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের বেতাউকা গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া বলেন, ছেলে মেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ঘরে টিকা দুবির্ষহ হয়ে পড়েছে। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করেও থাকা যাচ্ছে না। হাওর অধ্যুষিত চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের বেড়ি গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক ফররুখ আহমদ বলেন, হাওরের মানুষ নানা সংগ্রাম করে জীবন যাপন করলেও  
এবার হাওরবাসীকে কঠিন সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানি পান করে অনেক মানুষ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন সারেন। বর্তমানে পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হওয়ায় বাড়ি ঘরে থাকা দুঃসহ হয়ে উঠেছে।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশ মিয়া জানান, হাওর অঞ্চলের মানুষদেরকে বাঁচাতে হলে বিকল্প কর্মসংস্থান ও রেশনের ব্যবস্থা করা দরকার। তাঁর মতে সরকার প্রদত্ত ১৫টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয় কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড ভিত্তিক না দিলে তার সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি জানান, হাওর অঞ্চলের পানি দূষণের ফলে রোগব্যাধি মারাত্বকভাবে বাড়তে শুরু করেছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাসুম বিল্লাহ জানান, এমোনিয়ায় পচন ধরা মাছ না খাওয়ার জন্য আমরা উপজেলায় মাইকিং করে জানিয়েছি। তিনি বলেন, পানি দূষণমুক্ত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চুন দেয়া হয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শামস উদ্দিন আহমদ বলেন,বোরো জমিতে বিভিন্ন রকম সার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এসব জমির ধান এবার পাকার আগেই তলিয়ে গিয়ে পচন ধরায় পানি বিষাক্ত হয়েছে। যে কারণে বিষাক্ত হয়ে মাছ গুলো মরে গেছে। এসব বিষাক্ত মাছ ও পানি খেলে পেটের পীড়াসহ নানা রোগ বালাই হতে পারে। তাই মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মীদেরকে বলা হয়েছে মানুষকে এসব মাছ না খেতে নিরুৎসাহিত করতে। তিনি জানান সাম্প্রতিককালে উপজেলায় কিছু ডায়েরিয়াসহ পেটেরপীড়ার রোগী বেড়েছে। তবে তা আশংকাজনকহারে নয়। আমরা ইউনিয়ন ভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করে রেখেছি। তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলে এখন মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তা থেকে রক্ষা পেতে সবাইকে সর্তকতার অবলম্বন করতে হবে।