জগন্নাথপুর ‘আকমল ঠেকাও’ স্লোগানে ডুবানো হলো নৌকা

বিশেষ প্রতিনিধি ও জগন্নাথপুর অফিস
প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সোমবার আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য দলের একাংশের অসহযোগিতা, বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী’র প্রতি কর্মীদের দূরত্ব, সর্বোপরি ‘আকমল ঠেকাও’ ইস্যু তুলে নৌকা ডুবানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটার এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীলরা।
জগন্নাথপুরে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় প্রসঙ্গে জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ফররুখ আহমদ বলেন,‘জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আকমল হোসেনকে দলীয় প্রার্থী মনোনীত করা হলেও মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের সংগঠিত বা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা হয়নি। বর্তমান সরকারের শাসনামলে স্থানীয় সংসদ সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী যে উন্নয়ন করেছেন এটিও ভালভাবে মানুষের কাছে এখনো প্রচার হয়নি। ভোটাররা আমাদের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। এছাড়া দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা প্রার্থী হয়ে উল্লেখ করার মতো ভোট পাওয়া, দলের একটি অংশ বিএনপি’র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আকমল হোসেনের পরাজয় হয়েছে।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সম্পাদক হীরা মোহন দেব বলেন,‘আওয়ামী লীগের প্রার্থী’র সততা’র বিষয়টি সকলের জানা থাকলেও ভোটারদের মন জয় করতে পারেননি তিনি। নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে বুঝতে পেরেছি, তাঁর (আকমল হোসেনের) প্রতি ভোটারদের ভালবাসার কমতি ছিল।’
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজু বলেন,‘নির্বাচনে আজিজুস সামাদ ডন সমর্থকরা দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেয়নি। পৌর মেয়র আব্দুর মনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি একদিনও প্রচারণায় যোগ দেননি। কাউকে নৌকায় ভোট দেবার জন্যও বলেননি। অথচ. আব্দুল মনাফকে যখন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী করা হয়েছিল, আকমল হোসেনসহ আমরা ঘরে        
ঘরে গিয়ে নৌকা’র জন্য ভোট চেয়েছি। দলের এসব দায়িত্বশীলদের বিরোধীতা এবং উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক যাকে নির্বাচনের আগে বহিস্কার করা হয়েছে তিনি (মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা) বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলীয় প্রার্থীর ভোট কমেছে। গত পৌর নির্বাচনে মেয়র আব্দুল মনাফের নিজ কেন্দ্র আব্দুল তাহিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌর নির্বাচনের সময় সিংহভাগ ভোট পেয়েছিলেন আব্দুল মনাফ। এবার ধানের শীষ ৪১০ এবং নৌকা পেয়েছে ১৫০। ঠিক একইভাবে আজিজুস সামাদ ডনের কেন্দ্রে ধানের শীষ ১১৬ এবং নৌকা পেয়েছে ১০৫ ভোট। এসব আলামতই জানান দেয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ’।
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি জগন্নাথপুরের প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ছিদ্দিক আহমদ বলেন,‘দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নেগেটিভ প্রচারণা ছিল বেশি। অন্যদিকে, বিএনপি প্রার্থী তার নিজের এলাকায় আঞ্চলিকতার বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েছেন।’
জগন্নাথপুরের একজন শিক্ষক নিজের পরিচয় না ছাপার অনুরোধ জানিয়ে বলেন,‘জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীই স্লোগান তুলেছিলেন ‘আকমল ঠেকাও’ এরা কোথাও বলেছে আকমলকে না দিয়ে ধানের শীষে ভোট দাও, কোথাও বলেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে আনরসে ভোট দাও, আবার কোথাও বলেছে ভোট কেন্দ্রেই যেও না।’
দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় না থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়র আব্দুল মনাফ বলেন,‘দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করেছি, এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। আমি আকমল হোসেনের কর্মী নই। আমি আমার মতো কাজ করেছি। আকমল হোসেন একদিনও কোন সভা-সমাবেশে আমাকে দাওয়াত দেননি। শেষ নির্বাচনী সমাবেশে ছিদ্দিক আহমদ উপজেলা আওয়ামী লীগের কোন দায়িত্বশীল নেতা না হয়েও সভাপতিত্ব করেন। আমি সহসভাপতি আমাকে ডাকাই হয় না। আকমল সাহেব আমার গ্রামে গিয়ে সভা করেন, আমাকে ডাকেন না। ইচ্ছে করেই আমাদের সরিয়ে রাখা হয়। তবুও দল করি, আত্মীয়-স্বজনকে ভোট দেবার কথা বলেছি।’
প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের ছেলে আজিজুস সামাদ ডন বলেন,‘আমি দলীয় প্রার্থী’র পক্ষে সর্বাত্মভাবে চেষ্টা করেছি। প্রার্থীর পক্ষে ২-১ জনের আমিত্বের কারণে চেষ্টা হয়তো ফলপ্রসু হয়নি। প্রার্থীও জানেন আমার অবস্থান, যে টুকু করা সম্ভব, আমি তা করেছি। আমার কেন্দ্রে ৭ ভোটে পরাজিত হলেও, বিদ্রোহী প্রার্থী না দাঁড়ালে নৌকা ৪১ ভোট বেশি পেত।’
প্রসঙ্গত. জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আতাউর রহমান (ধানের শীষ) জয়ী হয়েছেন, তার প্রাপ্ত ভোট ২৯ হাজার ৯১৪। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকমল হোসেন (নৌকা), তার প্রাপ্ত ভোট ২৫ হাজার ১৯৮। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা (আনারস) পেয়েছেন ১৩ হাজার ৬১৫ ভোট।
নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিজন কুমার দেব  (নৌকা), তার প্রাপ্ত ভোট ২০২৪২। নিকটতম হয়েছেন বিএনপি’র প্রার্থী সুহেল আহমদ খান, তার প্রাপ্ত ভোট ১৫ হাজার ৩৩৮। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল উদ্দিন (তালা) পেয়েছেন ১১ হাজার ৬৭০ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী ফয়জুর হক (টিউবওয়েল) পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৯৫। বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’র প্রার্থী সৈয়দ ছলিম আহমদ (খেজুর গাছ) পেয়েছেন ১৪ হাজার ৭৫০ ভোট ।
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারজানা আক্তার (ধানের শীষ) বিজয়ী হয়েছেন, তার প্রাপ্ত ভোট ফারজানা আক্তার ২৮ হাজার ১৪৬ ভোট। নিকটতম হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হাজেরা বারি (নৌকা), তার প্রাপ্ত ভোট ২৩ হাজার ৮৩০ ভোট । মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী সুফিয়া খানম সাথী (ফুটবল) পেয়েছেন ১৬ হাজার ২৪৬ ভোট।