সালেহ্ আহমদ, এডভোকেট
বর্তমান সুরমা মার্কেট সংলগ্ন প্রিয় নদী সুরমার দক্ষিণ তীরে সুনামগঞ্জ স্টিমার ঘাট ছিল। হুইসেল, ভেপু বাজিয়ে স্টিমার জাহাজ ভিড়ত সুনামগঞ্জ শহরে। সুদূর কলকাতা থেকে স্টিমার আসত। স্টিমার ঘাট থেকে দক্ষিণমুখি রাস্তা দিয়ে সামান্য এগোলে ডানদিকে পশ্চিম বাজারে মাছ বাজার ছিল এবং পূর্ব দিকে জগন্নাথ বাড়ি। স্টিমার ঘাট থেকে দক্ষিণমুখি রাস্তাটি এগিয়ে বর্তমান আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট) এর বাম অংশে সুনামগঞ্জ কলেজ, যা মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়কাল এবং তৎপরবর্তী বেশ কয় বছর আমাদের শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসাবে মিছিল-মিটিং ও আড্ডায় সরব ও সরগরম থাকত। এর সোজা দক্ষিণ দিকে বাসস্টেন্ড ছিল। পয়েন্ট থেকে পূর্বমুখি রাস্তার বামপাশে প্রথম চৌচালা (বর্তমানে শহীদ মিনার সংলগ্ন) বাংলো বাড়িটি সুনামগঞ্জের মহকুমা মুনসেফ সাহেবের বাসভবন ছিল। এর পরেই বিশাল পুকুর পানিতে টইটুম্বুর থাকত। এর উত্তরপাড়ে সুনামগঞ্জ সিভিল হসপিটেল (হাসপাতাল)। পুকুরের পূর্বপাড়ে চৌচালা বাংলো টাইপের ভবনটিতে তৎকালীন লোকাল বোর্ডের অফিস ছিল। এর পূর্বদিকে অবস্থিত এস. ডি. ও. সাহেবের বাংলোটি উত্তরমুখি ছনের ছানিযুক্ত চৌচালা অভিজাত বাংলো ছিল। সম্ভবত সুরমা নদীর প্রাণখোলা সুবাতাস ও উত্তরপাড়ের মায়াবি পাহাড়ের হাতছানি দেখার জন্য এভাবেই বাংলোটি তখন উত্তরমুখি ছিল। লোকাল বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন জনাব আবু হানিফা আহমদ (নবাব মিয়া) (এডভোকেট জাহানুর ভাই-এর আব্বা)।
১৯৫৯ সালের ১৭ জুন, দিনটি ছিল বুধবার। সুনামগঞ্জের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক বি. আর. নিজাম সাহেবের সভাপতিত্বে তখনকার মহৎপ্রাণ কয়েকজন প্রাজ্ঞপুরুষ লোকাল বোর্ডের মিলনায়তনে বসেছিলেন একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার দূরদর্শী স্বপ্ন নিয়ে। তখন সুনামগঞ্জে বলতে গেলে কিছুই ছিল না, না ছিল বিদ্যুত, না ছিল তেমন কোনও যোগাযোগ অবকাঠামো। এমনকি পুরাতন কলেজ থেকে পূর্বমুখি রাস্তাটি রজন্তির পয়েন্ট পর্যন্ত সামান্য কিছু পাকা অংশ ছাড়া বাকি সবকটি রাস্তাই ছিল কাঁচা, নুড়িপাথর বসানো। কোন রিকসা ছিল কিনা এ বিষয়ে মতান্তর থাকলেও কয়েকটা বাইসাইকেল আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে দেখা যেত। এরকম একটা পিছিয়েপড়া সময়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার এই উদ্দ্যোগ সত্যিই অকল্পনীয়।
এই ছোট্ট মায়াবি শহরে তখন স্বল্পসংখ্যক লোকের বসবাস ছিল। অনেকটা বিচ্ছিন্ন ভিলেজ টাউনে বসবাস করলেও তাঁরা যে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে অগ্রগামী ছিলেন, বিষয়টি এখন চিন্তা করলেই চেতনায় শিহরণ জাগে। পাঠাগারে সংরক্ষিত ১৯৫৯ সালের প্রথম সভার কার্যবিবরণীটি দেখে আমি সেটির দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকাই। আমার কাছে তা জীবন্ত মনে হয়। এর কুশীলবরা এখন আর কেউ বেঁচে নেই। আমি সযতনে তা আলতো করে স্পর্শ করি। আমি তাঁদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই। পরম মমতায় আমি খোঁজি আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতির কণিকা। আমি খোঁজে পাই ১৯৬২ সালের প্রথম মুদ্রিত সংবিধানে সর্বজনাব আবু হানিফা আহমদ (নবাব মিয়া), দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী, দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী, হেমচন্দ্র চৌধুরী, মফিজ চৌধুরী, বিনোদ বিহারী নাগ, মজিবুর রহমান চৌধুরী, রফিকুল বারি চৌধুরী, সুধীর চন্দ্র চৌধুরী, আলফাত উদ্দিন আহমদ, সোনাওর আলী, আব্দুর রইছ, এ. জেড. এম. আজাদ বখ্ত, আছদ্দর চৌধুরী, মীর্জা গোলাম সামদানি, কাজী বশির উদ্দিন, আব্দুল হাই, আফাজ উদ্দিন মার্চেন্ট সহ আরো অনেকের নাম।
এই পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হচ্ছেন তৎকালীন এস. ডি. ও. জনাব বজলুর রহমান নিজাম। যিনি বি. আর. নিজাম হিসাবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। পাঠাগারের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জনাব মনোরঞ্জন চৌধুরী, এডভোকেট। তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে পাঠাগারের সূচনা কালের অনেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাঠাগারের প্রায় শুরু থেকে জনাব আবু নছর মোহাম্মদ ইয়াহইয়া লাইব্রেরিয়ান হিসাবে পাঠাগারে নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর সাথে ছিলেন মনোরঞ্জন বাবু নামে একজন সহকারী। তাঁদের পুরো লাইব্রেরির বই সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণাসহ আলমিরাতে বইয়ের অবস্থান মুখস্ত ছিল। পিয়ন মনোরঞ্জন বাবু লাইব্রেরির পিছন দিকে সপরিবারে বসবাস করতেন। লাইব্রেরিয়ান আবু নসর মোহাম্মদ ইয়াহইয়া সাহেব সারাদিন লাইব্রেরিতে পড়ে থাকতেন। নিকট অতীতে প্রাক্তন জেলাপ্রশাসক ও বর্তমান অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ আলী খান-এর ঐকান্তিক চেষ্টায় পাঠাগারের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসজ্জা, নতুন ফার্নিচার ক্রয়, শীততাপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র স্থাপন ও নতুন বই সংগ্রহ করা হয়েছে। পাঠাগারের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হুমায়ুন কবির জাহানুর সাহেবের সময়ে পাঠাগারটি অনেক আধুনিকায়নসহ লাইব্রেরির পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে। ১৯৫৯ সনে পাঠাগারের সূচনাকালে দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী সাহেবের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রচুর বই পাঠাগারে দান করা হয়। আরো অনেকে সে সময় ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই দান করেন। তিলে তিলে অসংখ্য মহৎপ্রাণ মানুষের শ্রমে আর ঘামে আজকের এই পাঠাগারের সুনাম ও সুষমা অর্জিত হয়েছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ এ আধুনিক সময়ে মানুষজনের বইপড়া অনেক কমে গেছে। পাঠাগারে উপস্থিতি আশংকাজনক কম। কিন্তু আমাদের সভ্যতা, কৃষ্টি সর্বোপরি অস্তিত্বের স্বার্থে আমাদের আবারও পাঠাগারমুখী হওয়া, বই পড়ায় মনোনিবেশ করা ছাড়া কোন বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। তাই আসুন বই পড়ি, হৃদ্ধ হই, পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করার কাজে ব্রতী হই। পাঠাগারের ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে সবাইকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার (সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি)
- তাহিরপুর ও দোয়ারায় গো-খাদ্য বিতরণ
- অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের সাথে জেলা কৃষক লীগের মতবিনিময়


