জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন

সোমবার ঢাকার আশুলিয়া থেকে নব্য জেএমবির যে চার জঙ্গি আটক হয় তার মধ্যে একজন আলমগীর হোসেন জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালি ইউনিয়নের হুগলি কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা। র‌্যাব জানিয়েছে তারা জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আশুলিয়ায় ঘাঁটি গেঁড়েছিল। ধৃত আলমগীর কৃষ্ণনগর গ্রামের আব্দুল হান্নানের ছেলে। সংবাদপত্রসূত্রে জানা যায় আলমগীরের দাদা আব্দুল করিম মক্তিযুদ্ধকালীন একজন চিহ্নিত রাজাকার এবং আলমগীরের পিতা এলাকায় আদম ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। আলমগীর সিলেটের মানিকপুর মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জামলাবাজ মাদ্রাসা এবং দরগাহপুর মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। আলিম পাস করার পর সে ঢাকা যায়। র‌্যাবসূত্রে জানা যায় আলমগীর আশুলিয়া এলাকায় একটি সুতার মিলে কাজ নিয়েছিল। আলমগীরের আগে জেলার ছাতক উপজেলার বাসিন্দা এক জঙ্গীও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনির হাতে ধরা পড়েছিল। সুনামগঞ্জ অঞ্চলের দুই জঙ্গী ধরা পড়ার কারণে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছি। সকল অভিভাবকের উচিৎ হবে তার সন্তানটি কোথায় কী করছে সে সম্পর্কে বিশেষভাবে খোঁজখবর রাখা।
সম্প্রতি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনি বহু জঙ্গি ঘাটি চিহ্নিত করে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিদের নির্মূল ও ধরতে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। গত বছরের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি আক্রমণের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনির এই কর্মকুশলতায় অন্তত একটি বছর দেশে তেমন কোন জঙ্গি তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় নি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনির উপর্যুপরি আক্রমণে জঙ্গিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তাদের শক্তি বৃহৎ পরিমাণে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তদুপরি আইন শৃঙ্খলা বাহিনি জঙ্গী দমন তৎপরতায় যে বিন্দুমাত্র শিথিল নয় বরং সর্বদাই সজাগ রয়েছে আশুলিয়ায় চার জঙ্গি ধরা পড়া তার উদাহরণ। আসলে জঙ্গি তৎপরতাটি সমাজ থেকে একেবারে নির্মূল হয়ে যাবে এমনটি ভাবা বোকামি হবে। কারণ এখন যে বিশ্ব পরিস্থিতি তাতে জঙ্গিবাদ উৎসাহিত হওয়ার মতো নানা কারণ রয়েছে। সমাজ দেহ থেকে এই ভয়াবহ বিপদ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সর্বদা সজাগ ও কর্মতৎপর থাকা প্রয়োজন।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির সাথে জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক শক্তির ভূমিকা বেশি জরুরি। কারণ জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দেয় বা জঙ্গিবাদে উৎসাহিত হয় এই সমাজের ভিতরেই কোনও না কোন জায়গায়। চোখ কান খোলা রাখলে এইসব অপতৎপরতার সাথে কারা জড়িত তা অজানা থাকার কথা নয়। কারও না কারও নজরে বিষয়টি পড়বেই। আমাদের সামাজিক দায়িত্ব হলো এই ধরনের বিপদ জানা মাত্র আইন শৃঙ্খলা বাহিনিকে অবহিত করা। অন্যদিকে জঙ্গিবাদের মতো একটি জঘন্য তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত আদর্শিক চর্চা সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ প্রতিনিয়ত এই ভয়ানক বিপদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলে অবশ্যই এটি সমাজে প্রভাব ফেলবে। জঙ্গিবাদে যারা জড়িত হয়ে পড়ে তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য বিশাল অংকের টাকা ও বাইরের সমর্থনের দরকার হয়। আসল কাজ হলো ওই আর্থিক উৎস ও যোগসূত্রগুলো নির্মূল করে দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজের ভিতর থেকে এই তৎপরতার বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী মতাদর্শিক লড়াই শুরু না হবে ততদিন পর্যন্ত এই ভয়ানক বিপদের আশংকা থেকেই যায়।
আজ যখন ছাতক কিংবা জামালগঞ্জের দুই তরুণ জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার দায়ে ধরা পড়ল তখন বুঝতে হবে বিপদ থেকে আমরাও মুক্ত নই। আমাদের তাই চোখ কান সবসময় খোলা রাখতে হবে। আসুন আইন শৃঙ্খলা বাহিনির সাহসি অভিযানগুলোর পাশাপাশি আমরা এর বিরুদ্ধে একটি সামাজিক প্রতিরোধ বলয় গড়ে তুলি। একই সাথে নিজেদের সন্তানদের গতিবিধি সম্পর্কেও সজাগ ও সতর্ক থাকি।