আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন
জনসভা হচ্ছে রাজনীতিবিদদের জনসাধারণের সাথে সংযোগের মোক্ষম রাস্তা। ঘরে ঘরে গিয়ে জনসংযোগ, উঠান বৈঠক, প্রচারপত্র বিলি, মাইকিং, ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমেও জনসাধারণের সাথে সংযোগ রক্ষা করা সম্ভব। ইদানিং চল হয়েছে মানববন্ধনের। এটি নিরাপদ। পরিশ্রম কম সময়ও কম লাগে। প্রচার পাওয়া যায় বেশি। এটিকেও গণসংযোগ বলা যেতে পারে। তবে আর যত ব্যবস্থাই বলা হউক না কেন জনসভার মত গণসংযোগের দ্বিতীয় পন্থা আজো আবিস্কৃত হয়নি।
এ জনসভার শত শত বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। বৃটিশরা এ উপমহাদেশে রাজনৈতিক দল গঠন করার উৎসাহ যোগায়। এরপর প্রথম রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস জন্ম লাভ করে ১৮৮৫ সালে। এর বহু বছর পর ১৯০৬ সালে মুসলীম লীগ গঠিত হয়। ১৯৩৫ সাল থেকে সীমিত জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা চালু হলে জনসম্পৃক্ততা শুরু হয়। এবং ক্রমশঃ তা বিস্তৃত হতে থাকে।
এ সম্পৃক্ততা কার্যকরভাবে বাড়ানোর জন্যই জনসভার সূত্রপাত। জনসভা ছাড়া জনসেবা পূর্ণ হয় না। জননেতাও হওয়া যায় না। রাজনীতি যারা করেন তাদের জনসভার প্রতি আকর্ষণ এবং আস্থা থাকতেই হয়। জনতারও জনসভা ছাড়া নেতাদের বক্তব্য শুনার সুযোগ খুবই কম। তাই তারাও জনসভার অপেক্ষায় থাকেন। জনসভা নিয়ে রয়েছে অনেক সুখের ও বেদনার স্মৃতি এবং এটির রয়েছে অম্লমধুর ইতিহাস।
সে যাই হোক জনসভার ইতিহাস বর্ণনা আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। সেটি এ পরিসরে সম্ভবও না। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম জনসভার আগে টিনের চুঙ্গা ফুঁকে সারা শহরময় এর দিন তারিখ প্রচার করা হত (তখনও মাইকের ব্যবহার শুরু হয়নি)। ঘোষণা করা হত নেতৃবৃন্দের নাম। কারা কারা এ সভায় বক্তৃতা করবেন। কাগজে বড় হরফে পোস্টার লিখে দেয়ালে বা প্রকাশ্য স্থানে লাগানো হত। যাতে তা জনসাধারণের চোখে পড়ে। চিকা মারা হত। আলকাতরা দিয়ে রাস্তায় ও দেয়ালে বিভিন্ন শ্লোগান লিখে রাখা হত। তাতে ঐ দলের আদর্শবাণী প্রচার পেত। মানুষ ঐ সমন্ত জনসভা দ্বারা উজ্জীবিত হত। চাঁদাও দিত।
আমাদের সময়ে স্থানীয় পুরাতন কলেজ প্রাঙ্গণ (এখন এটি পৌরমার্কেট) ছিল জনসভার মূল ঠিকানা। তবে জনসমাগম বেশি হলে বর্তমান স্টেডিয়াম মাঠে (তখন বলা হত ‘এ’ টিম ফিল্ড আর বুলচান্দ স্কুল সংলগ্ন মাঠকে ‘বি’ টিম ফিল্ড বলা হত) এর আয়োজন হত। সরকারি জুবিলী স্কুল মাঠেও সভা হতে দেখেছি। জনসভার শুরুতে সভার সভাপতি হিসাবে একজনের নাম প্রস্তাব করা হত। দু’জন তা সমর্থন করত। এভাবে সভার কাজ শুরু হত। কোন কোন সভায় কাজের শুরুতে পবিত্র কালাম শরীফ থেকে তেলাওয়াত করা হত। বক্তারা চেয়ার কিংবা কলেজের সিঁড়িতে বসতেন। শ্রোতারা রাস্তার পাশে, দোকানে যে যেখানে পারেন বসতেন। কেউ কেউ হাটাহাটির মধ্যে থাকতেন। এ হাটাহাটি নিয়ে একটি ঘটনা বলছি একটু পরে।
সভার বক্তৃতা কভার করার জন্য পুলিশের ডিআইবি’র লোকেরা ঘোরাফেরা করত। থানার বারান্দায় অন্য কর্মকর্তারা নোট নিতেন। নেতারা প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তৃতা করতেন। ছাত্র নেতারা প্রথমে বলতেন। মানুষ সভার বক্তব্য উপভোগ করত। সমর্থনও করত। কারণ সভার শেষে সভায় গৃহীত প্রস্তাবাবলী পাঠ করে শুনানো হত। তারপর বলা হত এতে আপনাদের সমর্থন আছে? জনগণের পক্ষ থেকে বলা হত ’হ্যাঁ’ । সভাপতি উঠে বলতেন তাহলে প্রস্তাব পাশ হয়ে গেল।
শামসুন্নাহার বেগম শাহানা এমপির আব্বা এডভোকেট সোনাওর আলী সাহেব সম্পর্কে আমার দুলাভাই। তিনি ছিলেন ন্যাপের সভাপতি। সিনিয়র আইনজীবী হিসাবে সর্বদলীয় অনেক সভায়ও তিনি সভাপতিত্ব করতেন। একবার এক সভা শুরুর আগে সব নেতৃবৃন্দ ট্রাফিক পয়েন্টের তৎকালীন এক ফার্মেসিতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। আমি সেখানে প্রবেশ করি। সোনাওর আলী সাহেবকে বল্লাম আমি তো আপনার বক্তৃতা শুনতে আসি। কিন্তু আপতি তো বক্তৃতা দেন না শুধু বলেন ‘প্রস্তাব পাশ হয়ে গেল’। এছাড়া আর আপনার কিছুই করণীয় থাকে না। ঐ আড্ডায় অন্যান্যদের মাঝে ব্যারিস্টার ইমনের আব্বা এম.এ. রইছ এম.পিও ছিলেন। তিনি আমার এ কথায় মনক্ষুন্ন (ভেবেছিলেন নেতাদের অবমূল্যায়ন করছি) হয়ে বল্লেন ইনি কে? সোনাওর আলী সাহেব বল্লেন ‘ইনি আমার বড় কুটুম’। রইছ সাহেব বল্লেন তাহলে তো তিনি তা বলতেই পারেন।
জনসভায় হাটাহাটি নিয়ে বলছিলাম পরে বলবো। একবার ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ভাষণ শুনছি। দেখি আমাদের সুনামগঞ্জের প্রাক্তন এস.ডি.ও. জনাব এ.জেড.এম. শামসুল আলম সাহেব স্টেডিয়াম মার্কেটে হাঁটছেন। আমাকে তার হাতে থাকা বাদাম খেতে দিলেন। বল্লেন চলেন হেটে হেটে বক্তৃতা শুনি। দেখলাম এটা তার অভ্যাস। আমার অভ্যাস এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বা বসে মনযোগ দিয়ে বক্তব্য শুনা। কত জনের কত রকম অভ্যাস থাকে।
নেতাদের জনসভার জন্য থাকত আলাদা পোশাক। এটাকে রস করে বলা হত ‘মিটিং কা কাপড়া’। নেতারা মানুষকে আবেগ তাড়িত করে তাদের দ্বারা যেকোন কাজ করাতে পারেন। তারা ওঝার মন্ত্র জানেন। নেতারা সাপ বশিভূত করার মত জাদু মন্ত্রবলে মানুষকে বশ করতে পারেন। তাদের দেখাতে পারেন সঠিক রাস্তা। সবাই তা পারে না। কেউ কেউ অবশ্য তা পারেন। যেমন ৭ই মার্চের ভাষণ। এতে ছিল আমাদের মুক্তির দিকনির্দেশনা। সম্প্রতি ৭ই মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়ে শুধু ভাষণকে নয় আমাদের পুরো জাতিকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সম্মানিত করেছে বলে আমি মনে করি।
আমি তখন ঢাকায়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় কাজ করি। আমাকে বলা হল রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বঙ্গবন্ধুর একটি ঐতিহাসিক জনসভা কভার করে রিপোর্ট করার জন্য। লোকে লোকারণ্য বিশাল মাঠ। বিরাট জনসভা। সাংবাদিকদের জন্য রক্ষিত একটি চেয়ারে আসন গ্রহণ করলাম। সবার শেষে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ দিতে আরম্ভ করলেন। আমি মনযোগ দিয়ে শুনছি ও নোট নিচ্ছি। আমার পাশেই বসা এক মহিলা সাংবাদিক। ইনি জার্মান বেতারের প্রতিনিধি। বাংলা এক বাক্য বুঝে না। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরু হওয়ার পর সে উতলা হয়ে উঠে। আমাকে অনুনয় বিনয় করে রাজি করাল বঙ্গবন্ধু নতুন কোন উল্লেখযোগ্য নীতিনির্ধারণী কথা বললে আমি যেন তাকে বলি। আমি তাকে কিছু বলার আগেই সে বারবার বলতে লাগল ‘ওং ঃযবৎব ধহুঃযরহম হব?ি’ আমি না বল্লে সে মনে করে আমি তাকে ইচ্ছা করে বলছি না। সে বলল তার খবর পাঠানোর সময় চলে যাচ্ছে আমি যেন তাকে দয়া করে সাহায্য করি। সে সভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়ে দেব’। তাকে অনেক কষ্টে এটা বুঝাতে পেরেছিলাম। এতেই সে খুশি হয়ে চলে যায়।
প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ ময়মনসিংহের লোক। তার এক সভায় একজন প্রশ্ন তুলেছিল আপনি এতদিন পর এলেন। ছিলেন কোথায়? মানে দীর্ঘ অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা সে দাবি করে। আবুল মনসুর আহমদ সেজন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন তোমাদের ‘পাটের দাম কমে নাই’? সবাই বল্লো হ্যাঁ হ্যাঁ। তিনি নাকি বলেছিলেন এ বিষয়ে নালিশ জানাতে তিনি পায়ে হেটে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে লন্ডন গিয়ে এ পাটের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে নালিশ জানিয়ে এসেছেন। পুরো কাহিনী আরো মজার। সবটুকু বললে মজাই লাগত। কিন্তু এ পরিসরে তা সম্ভব নয়। তার এ কেচ্ছা পাবলিক খেয়েছিল। তিনি পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন।
আগেকার দিনের মত এখন জনসভার আয়োজন হতে খুবই কম শুনা যায়। তবে সময়ের পরিবর্তনের কারণে মানুষের রুচির সাথে সাথে জনসভার চালচিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন বেশি শুনা যায় গণসম্বর্ধনার ঘোষণা। এজন্য ব্যাপক মাইকিং এর সাথে সাথে রয়েছে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের চার কালার পোস্টার, ব্যানার, প্লেকার্ড আরো কত কি। কোন মহৎ কর্ম সম্পাদন উপলক্ষে একজন সম্বর্ধনা পেতেই পারেন। তবে সেটি কখনই জনসভার বিকল্প হতে পারে না। এতে কতটা আগের মত আন্তরিকতা রয়েছে তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। প্রশ্ন রয়েছে এ বিবর্তন সম্পর্কেও। প্রত্যেক কাজই ভবিষ্যতের নিকট জবাবদিহি। সে বিচারে আমরা কতটা এগুলাম তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আমরা যারা পুরানো দিনের মানুষ তাদের কাছে পুরানো দিনের গানের মত আগেকার জনসভার স্মৃতিই বেশি সুখকর।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী।


