জেলার ইজারা দেওয়া জলমহালগুলোর সীমানা চিহ্নিত না হওয়ার কারণে একদিকে জেলে কৃষকরা ভাসান পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে ইজারাদারদের সহিংস বাধার সন্মুখীন হচ্ছেন অন্যদিকে যেসব জলমহাল ইজারা দেওয়া হয় নি সেখানেও স্থানীয় প্রভাবশালীরা একই কায়দায় সাধারণ মানুষকে মাছ ধরার ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছেন। গতকাল এ বিষয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে হাওরে-ভাসানপানিতে মাছ ধরতে গিয়ে জেলে কৃষকদের সাথে ইজারাদারদের মুখোমুখি অবস্থা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সেখানে শুধু এই বছর বিভিন্ন জলমহালে ৬ ব্যক্তির নিহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। মাছ ধরা নিয়ে সংঘর্ষে ছয় ব্যক্তির প্রাণ নাশের ঘটনা কোন তামাশা নয়। অবস্থার ভয়াবহতা বুঝাতে এই পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট। প্রশ্ন হলো বিভিন্ন জলমহালে এই যে সহিংস অবস্থা বিরাজমান তার নিরসনকল্পে প্রশাসন কেন জলমহালগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না ? জেলা প্রশাসক বলেছেন, তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সীমানা নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা সার্ভেয়ারের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণের কথা বলেছেন। এই কথাগুলো যখন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তখন হাওর থেকে পানি নামা শুরু করেছে। ভাসান পানি বলতে যা বুঝায় সেটি হলো জলমগ্ন হাওরের এক ধরনের বাস্তবতা। হাওরে পানি না থাকলে ভাসান পানি নামক ভৌগোলিক প্রপঞ্চটি অনুপস্থিত থাকে। পানি সরে গিয়ে এখন বিল সীমার মধ্যেই পানি আটকে থাকবে। এখন জলমহালের সীমানা নির্ধারণ করা না করা নিয়ে আসলে জেলে কৃষকদের খুব বেশি লাভ-ক্ষতি নেই। সীমানা নির্ধারণের কাজটি বর্ষা মওসুমের শুরুতেই করা হলে জেলে কৃষকরা লাভবান হতো এবং জলমহালে সংঘর্ষের মাত্রাও অনেক পরিমাণে কমে আসত। কিন্তু এই কাজটি কখনও হয় না। না হওয়ার পিছনে আমরা শুধু প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করব না বরং এর পিছনে যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে সেটিকেই মূল কারণ হিসাবে উল্লেখ করব। জলমহালগুলো এখন যারা ইজারা নেন তারা কোন না কোনভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট ব্যক্তি। ইজারাদার নামক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন অনেকক্ষেত্রেই শক্ত পদক্ষেপ নিতে ভয় পান। আবার ইজারাদাররাও প্রশাসনকে নিজ পক্ষে রাখতে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেন। জলমহাল ইজারা ব্যবস্থায় এই রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সখ্যতার অবসান না ঘটলে আসলে সাধারণ জেলে কৃষকদের ভাসান পানিতে মাছ ধরার সহজাত অধিকার সবসময়ই ভূলুণ্ঠিত হতে থাকবে।
নীতিমালা অনুসারে জলমহাল ইজারায় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলোর অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কাগজে পত্রে বিভিন্ন জলমহাল এরকম সমিতির নামেই ইজারা দেওয়া দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবে অবস্থা উল্টো। প্রভাবশালীরাই এসব সমিতি নিয়ন্ত্রণ করে বরাবরের মতো জলসর্দার হয়ে মাছের রাজত্ব শাসন করছে। নীতিমালাকে এরকম বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর বিষয়েও কখনও কোন প্রতিকার দেখা যায় না। এর বাইরে এবার যেসব জলমহাল ইজারা দেওয়া হয় নি সেখানেও স্থানীয় প্রভাবশালীদৈর টুকেনের মাধ্যমে চাঁদাবাজিসহ মাছ ধরায় বাধা নিষেধ আরোপের ঘটনা ঘটেছে।
সার্বিকভাবে জলমহালগুলোতে সুশাসন ও ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার কায়েম করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। এই সদিচ্ছা জাগ্রত হলে প্রশাসনিক দুর্নীতি বা সহায়তা বন্ধ করা কঠিন কোন কাজ হবে না।

