জাগো নারী বহ্নিশিখা

শেখ আয়শা বেগম 
আজ ভাবছি পায়ের জোর কতো দিন? তার চেয়ে লেখনীর জোর তো অনেক বেশী। তা কেন করলাম না। করিনি ঠিক কিন্তু মাঝে মাঝে স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক ও সুহৃদের আহবানে সামান্য লিখেও থাকি। কৈশোরে আমি গানের মতো কয়টি লাইন লিখেছিলাম।
একটি ছিল এই রকম-
ওগো সুন্দর তুমি কোথায় তুমি কোথায়,
ভর জোছনায় তব খেয়া খানি,
মোর হৃদি তটে ভিড়াও আনি-
আমি ভেসে যাকে তব আলোর প্লাবনে বিকশিত হব তোমার ছোঁয়ায়
তুমি কোথায়?”  
অন্যটি ছিল-
তুমি এনে দিলে মুক্তির বারতা স্বাধীনতা
মুক্তি এলো ভাষা ও গানে মুক্তি এলো জীবনে
ও প্রাণে নবারুণ তার অরুণ রাগে টুটেছে কালো রাতের ব্যথা স্বাধীনতা/
আমার মনে হয় তখন শুধু আমি নয় আলোর সেই পদার্পনে আমার মতো অসংখ্য কিশোর কিশোরী জেগে ঊঠেছিল। এক মহিমায়। একটা জাতির বাস্তব এক শুভ মুহূর্ত তখন। আকাশে বাতাসে ছড়ানো বিস্ময়কর মুক্তিযুদ্ধের অশ্রুভেজা গল্প, বিজয়ের উল্লাসে সব কিছু মিলিয়ে এক মুগ্ধ চৈতন্যের সবুজ আঙ্গিনায় আলোকিত সকাল। সে সময় আমাদের গ্রামে একদল তরুণ লেখাপড়ার পাশাপাশি সমাজ সেবার লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় মেতে উঠেছিল। এই ছিল দেশপ্রেম, আর সুস্থ সমাজ গঠনের তারুণ্যের সুন্দরতম প্রকাশ। মেঝো ভাই ও কাগজী ভাই এর সহযোগিতায় আমি গড়েছিলাম শিশু কিশোর সাংস্কৃতিক সংগঠন শাপলা শালুক। এত বছর পর হয়তো আমার মত আমার হারিয়ে যাওয়া সাথীদের চুলেও পাকা ধরেছে।  
অনেকের খবর লই কারো কারো সাথে দেখাও হয়। কিন্তু সেই দেশপ্রেম আর মানুষের জন্য ভালবাসা কারো চোখে খুঁজে পাই না। অনেকেই অর্থ, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার লড়াইয়ে গলদ ঘর্ম। সুন্দরের সেই স্বপ্ন বলাকা দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে বুকের ভিতর পাখা ঝাপটানোর শব্দ খুঁজে পায় না। এমনি হতোদ্যম অবস্থা। দেড় যুগ ধরে কাজ করছি সাংগঠনিক ব্যানারে যে পরিষদটি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নামে খ্যাত। কেউ কেউ প্রশ্ন করে এই কাজের বেনিফিট কি? আশ্চর্ষ্য, মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হলো চার লাখ নারীর তার সম্ভ্রম হারালো এর বেনিফিট কি? এর বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাসযোগ্য একটা দেশ পেয়েছি। শুধু নারী নির্যাতন আর প্রতিরোধ আর দেন মোহর আদায় নয় সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় মহিলা পরিষদের ভুমিকা আছে। কিছু দিন আগে এক গ্রামের তিন মহিলাকে এক ঘরে করে রেখেছিল সমাজপতিরা। একই ঘরে থাকতো বৃদ্ধ অন্ধ মা, বিধবা মেয়ে ও বিধবা পুত্রবধু। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা যাই তদন্ত করতে। তাদের উপর মিথ্যা অপবাদের প্রতিবাদ করি। অন্যায়কারীরা সংশোধিত হয়ে নিজেরাই প্রতিরোধ উঠিয়ে নেয়। এবং আমাদের আস্বস্থ করে যে, এই তিন বিধবার সম্মান ও তাদের জীবন-জীবিকা অতিবাহিত করাব। এ কাজগুলো কি মানুষের কাজ নয়?
এখন আসল কথায় আসি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ হলো একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ের কারণে শিক্ষিত নানা পেশাজীবী বোনদের নিয়ে আলাপ হয় মানবিক সমাজ গঠনে যাদের ভুমিকা অগ্রগণ্য মনে করি। অর্থনৈতিক মুক্তি যদি মানবিক মুক্তি নাই আনলো তাহলে আফসোস ওই যান্ত্রিক জীবনের। মানুষের মানবীয় ভাবনা নারী পুরুষের সুস্থ চিন্তা ধারাকে উন্নয়ন এবং শান্তির পূর্বশর্ত হিসেবে ভাবছে তখন আমার চারপাশে দেখেছি অসংখ্য নারী নির্যাতনকারী, শিশু ধর্ষণ, সম্ভ্রম হারিয়ে তরুণীর আত্মাহুতি। শিশু রাজন, রাকিব, জোনায়েদ হত্যার মতো মর্মান্তিক চিত্র আমরা দেখেছি। দেখেছি সোহাগী জাহানের তনু’র ভয়াবহ মৃত্যু। মানবতার চরম বিপর্যয় না ঘটলে এগুলো ঘটছে কি ভাবে? এই মুহূর্তে লিখা নয় আমার চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটাই একটা মাঠ হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত নারীরা মাঠে। পিনপতন নিরবতা । আমরা মানুষ মানুষ যদি মানুষ না হয়ে থাকি তাহলে মানূষ জম্মানোর আর প্রয়োজন নাই। কি হবে মানুষ জম্ম দিয়ে। যদি মানুষ বানানোর দায়িত্ব পালন না করা যায়। জম্মদাত্রী হিসেবে শুধু নয়, এক জন মা, একজন বোন, একজন স্ত্রী হিসেবে কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার আছে আমাদের। যে নারী স্থিরতায় দৃঢ়তায়, বিবেক এবং মানবীয় চেতনায় শক্ত সমুজ্জ্বল তার আপন কেউ এমন কাজ করতে পারে না। তাই প্রয়োজন উদার মানবিকতা চেতনা, নারীত্বের সমৃদ্ধ জাগরণ, জননীর মার্যাদা। তা না হলে জননীর পদতলে জান্নাত” কথাটির মুল্যে থাকে না। নারী শিক্ষা ও নারী জাগরনের অগ্রদুত বেগম রোকিয়ার কথাটি ভুলে যাই। আলোকিত নারীদের অবদান এদেশের প্রতিটি আন্দোলনকে পূর্ণতা দিয়েছে। আমরা মনে করতে পারি সাওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, নাগা বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার পতন, সিপাহী বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ এদেশের মহীয়সী নারীদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সফল হয়েছে। আর এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা মহিয়সী নারী সুফিয়া কামালকে সম্মোধন করেছেন জননী সাহসিকা বলে। নারী স্বাধীনতা কোন লম্ফ ঝম্পের বিষয় নয়। এ কেউ কাউকে দিতে পারে না। এ লড়াই সংগ্রাম করেই আদায় করে নিতে হয়। বাস্তবতা এই যে, আমার বাবা আমার জীবন সঙ্গী। আমার ছেলে আমার সহকর্মী, আমার মেয়ে একজন সহযোদ্ধা। তাই যৌথ মহানুভবতার বন্ধনে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, জামালগঞ্জ উপজেলা শাখা।