জামালগঞ্জে এক পরিবারের ৭ জনই বাক প্রতিবন্ধী, অভাব অনটনে অনিশ্চিত জীবন তাদের

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
এক পরিবারের ৭ জনই বোবা। এমন খবর সংগ্রহে গেলে তাদের বাড়ির বিপরীত পারে খেয়াঘাট সংলগ্ন লালপুর বাজারে দেখা হয় তাদের একজনের সাথে। সে ওই খেয়া নৌকার চালক। বাবার অনুপস্থিতিতে পারাপারের হাল ধরে সে। তাকে বাজারে পেয়ে তোমাদের বাড়িতে যাব বললে নিরুত্তর হাঁটতে থাকে তেরো-চৌদ্দ বছরের বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরটি। নৌকার দিকে হাঁটার গতি দেখে বোঝা গেল হয়তো নৌকায় উঠার ইঙ্গিত করছে সে। তার পিছু হেঁটেই নৌকায় ওঠা। কোনো কথা না বলে নৌকার ইঞ্জিন চালিয়ে বিপরীত পারে ছুটতে লাগল। গন্তব্যে নৌকা ভিরতেই দেখা গেল প্রতিবন্ধী আরেক ভাই সেখানে দাঁড়িয়ে। দুই ভাইকে নিয়েই তাদের বাড়িতে ওঠা।
সেখানে যেতেই চোখ চলে যায় উষ্কখুষ্ক অগোছালো চুল আর ছিন্ন বসনধারী মেয়েটির দিকে। কথা না বলতে পারলেও হাই-হুই অবলা ভাষায় আমাদেরকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে সে। তার অস্বাভাবিক আচরণ দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল সেও ওই ৭ প্রতিবন্ধীর একজন। বাড়িতে থাকা অন্য ভাইবোনদের অপ্রকৃতিস্থ বোবা চেহারায় স্পষ্টতই ভেসে উঠছিল প্রতিবন্ধীত্বের চাপ। মুখে কথা নেই, হাসি নেই। নিষ্প্রাণ মুখচ্ছবি দেখলে বোঝা যায়, কষ্টের তাড়নায় কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না তারা। এক অভিশপ্ত জীবন নিয়েই তাদের বেঁচে থাকা।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে ওই প্রতিবন্ধী পরিবারের বাস। আলী উস্তার ও মিনারা বেগম দম্পতির ৯ সন্তানের ৭ জনই বাক প্রতিবন্ধী। তাদের ৬ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের মধ্যে ৫ ছেলে, ২ মেয়েই বোবা। কথা বলতে পারে না। তাদের এই প্রতিবন্ধীত্ব জীবন জন্মগতই বলে জানিয়েছেন মা মিনারা বেগম। এই ৭ বাক প্রতিবন্ধীর দুইজন কেবল প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। অন্যরা এখনো প্রতিবন্ধী ভাতা পায় নি।
প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের জীবন নিয়ে চিন্তিত মা মিনারা বেগম বলেন, ‘এখন হয়তো তাদেরকে নিয়া কোনো রকম চইল্যা যাইতাছি। তারার বাপ এমনিতেই অসুখে ভোগতাছে। কোমর ধরা লইয়াই ফেরি নৌকাডা চালায়। যদি বাপ বিছনাত পড়ে তাহলে কি হইব। কেমনে চলব সংসার। তখন তো না খাইয়া উপাসে মইরা যাইব আমার পুলাফান। সরকার থাইক্যা আমার বোবা ছেলেমেয়ের নামে স্থায়ী একটা কিচ্ছু কইরা দিলে একটু চিন্তামুক্ত হইতাম।’
ভাতাদি কিছু পান কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘দুইটার নামে ভাতা পাই। দুই-তিন বছর আগে খবর পাইয়া ডিসি সাব (সাবিরুল ইসলাম) আমরার বাড়িতে আইছিল। তখন তাইন অফিস থাইক্যা মানুষ পাঠাইয়া দুইডা ভাতা কইরা দিছইন। কিন্তু মেম্বার চেয়ারম্যানরা কেউ কোনোদিন আমরার খবরই লইছে না। এখনও লয় না। বোবা পোলাপানরে নিয়ে কিভাবে আছি সেটা কেউ দেখে না।’
মিনারা বেগমের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, তার একটা মেয়ে ও একটা ছেলে শুধু কথা বলতে পারে। কথা বলা মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিছেন। সে এখানেই থাকে। বারো-তেরো জনের পরিবার নিয়ে খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তারা। স্বামী আলী উস্তার হোসেনপুর ও লালপুরের মধ্যকার ফেরি চালিয়ে যে আয় করেন, সেটা দিয়েই কোনোরকম পরিবার চলে। কোমরে ব্যথা বাড়লে স্বামী আর ফেরি চালাতে পারেন না। তখন বোবা ছেলেদের যেকোন একজনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফেরি চালাতে পাঠানো হয়। নইলে উনুনে হাড়ি বসে না তাদের।
প্রতিবেশী সামছু উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। একটা পরিবারের ৯ জন ছেলেমেয়ের মধ্যে ৭ জনই প্রতিবন্ধী হলে কতটা কষ্ট তা শুধু ওই জন্মদাতা মা-বাবাই বুঝতে পারছেন। ওই পরিবারটি সত্যিকার অর্থেই কষ্টের মধ্যে আছে। অভাব-অনটন তো আছেই। গ্রামের মানুষ যদিও তাদের কিছুটা সাহায্য-সহযোগিতা করে, তবে তা দিয়ে কি পরিবার চলে? এদের প্রতি একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মুজাফফর হোসেন বলেন, ‘কোন সমস্যা হলে আমাকে বললে আমি চেষ্টা করব। আমাকে না বললে তো আমি কিছু করতে পারি না।’
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রজব আলী বলেন, ‘এদের দুইজন প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। আরেকজনের নাম দেওয়া হইছে। আর যেকোন ত্রাণ সামগ্রী আসলে তাদেরকে দেওয়া হয়। আমি ওই পরিবারটির প্রতি সর্বদাই নজর রাখি।’
পিতা আলী উস্তার বাড়িতে না থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুনামগঞ্জ জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুচিত্ররা রায় বললেন, বিগত অর্থ বছর পর্যন্ত ভাতার বরাদ্দ ছিল কম। এজন্য একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে ভাতা দেওয়া যায় নি। জুলাই মাস থেকে ভাতার বরাদ্দ বেড়েছে। এখন থেকে সকল প্রতিবন্ধীই ভাতার আওতায় আসবে। (১)