জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর প্রতিনিধি
জামালগঞ্জ উপজেলায় ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ছয়হারা গ্রামে চড়ক পূজা ও গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় শুক্রবার সন্ধ্যায় শেষ হয়েছে এই পূজা। এর আগে সকাল থেকে শুরু হয় চড়ক পূজা ও মেলা। শত বছরের অধিক সময় ধরে চলে আসা প্রাচীন ঐতিহ্যে লালিত চড়ক পূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে জামালগঞ্জে ছয়হারা গ্রাম সহ আশপাশ এলাকায় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, চড়ক পূজা উদযাপনে এক মাস আগে থেকে বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক লোক সন্নাসী ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গ্রামের সনাতনী হিন্দু বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৌরী নৃত্য সহকারে ভিক্ষাবৃত্তিতে অংশ নেয় এবং পবিত্রতার সাথে সন্ন্যাস ব্রত পালন করেন। নিরামিষ ভোজন করেন ও সারাদিন উপবাস থাকেন তারা। চড়কপূজা দুইদিন আগে পূজারীরা শ্মশানে গিয়ে পূজা অর্চনা করেন। পূজায় নিশিরাতে তান্ত্রিক পূজারিরা পান বাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রন জানান। এরপর পাশর্^বর্তী পাকনার হাওরের ঐতিহাসিক ছয়হারা গ্রামের পাশের দিঘী থেকে তোলা হয় চড়ক গাছ। এই গাছের চূড়া থেকে মাচা পর্যন্ত চারটি মোটা বাঁশ পাখার মতো করে বাধা হয় এবং বাঁশে যুক্ত করা হয় মোটা লম্বা রশি।
চড়ক পূজা দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষ দর্শনার্থী সমাগম ঘটে উৎসব স্থলে। দুপুরে শুরু হয় শিবের নৃত্য। নৃত্যের তালে তালে চড়ক গাছ ঘোড়ানো হয়। পূজা অর্চনা শেষে মূল সন্নাসীরা ভক্তের (জীবিত মানুষের) পিঠে বর্শী গেঁথে ঝুলিয়ে চড়ক গাছ ঘোরানো হয়। এসময় দর্শনার্থীরা অনেকে বাতাসা, কলা, উপরের দিকে উড়িয়ে দেন আর দর্শনার্থীরা তা কুড়িয়ে নেন। চড়ক পূজা উপভোগ করতে প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন উপজেলা থেকে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে দর্শনার্থীর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এই পূজা উপলক্ষে দিনব্যাপী বিশাল মেলা বসে।
এ বিষয়ে পূজার মূল সন্নাসী চন্দ্রধর তালুকদার বলেন, এই জগতে যারা মহাদেবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য স্বেচ্ছায় এমন কঠিন আরাধনার পথ বেছে নেন তারা মহাদেবের আশির্বাাদে মৃত্যুর পরে স্বর্গ লাভের সুযোগ পাবেন। এই চড়ক পূজা হলো গম্ভীরা এবং শিবের গাজনের রকম ফের। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিনে এই পূজা হয়। এই পূজায় আরেক অঙ্গের নাম নিলপূজো। পূজোর আগে চড়ক গাছের তল এবং চড়ক গাছটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিছন্ন করে নেওয়া হয়। এর পাশেই একটি পাত্রে জল ভরে তাতে শিব ঠাকুরের প্রতীক শিবলিঙ্গ রাখা হয়।
এই বিষয়ে ফেনারবাক ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীণ মুরব্বি করুণা সিন্ধু তালুকদার বলেন, চৈত্রমাসের সংক্রান্তির আকর্ষন থাকে চড়ক পূজায়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে শত বছরের অধিক সময় ধরে ছয়হারা গ্রামে পূজা ও মেলা হয়ে আসছে। সেই সাথে কৃষকের সোনার ফসল সুষ্ঠুভাবে ঘরে তুলতে প্রার্থনা করা হয়। বিশেষ করে পূজা আয়োজকগণ ও উপজেলা প্রশাসনের লোকজনকে ধন্যবাদ জানাই সুন্দর ভাবে পূজা ও মেলা সম্পন্ন করার জন্য।

এদিকে বিশ্বম্ভরপুরেও জাঁকজমকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার বিকালে বিশ্বম্ভরপুর শিব মন্দির প্র্রাঙ্গণে ২ জন সন্ন্যাসীর পিঠে লোহার বড়শী গেঁথে চড়ক গাছের দুইপাশে ঝুলিয়ে এবং ঘুড়িয়ে চড়ক পূজার মূল কর্মসচি পালন করা হয়। চড়ক পূজার মূল সন্ন্যাসী ছিলেন শ্রীধাম সন্ন্যাসী এবং সহযোগিতায় ছিলেন শুনীল বর্মণ ও কৃষ্ণ বিশ্বাস। বড়শী গাঁথা হয় রন্জিত বিশ্বাস ও দ্বীপজল বিশ্বাসকে। চড়ক গাছ ঘোরানোর পূর্বে দুপুর থেকেই সন্ন্যাসীরা তান্ত্রিক মন্ত্র দ্বারা বিভিন্ন পূজা ও আষর্কনীয় খেলা প্রদর্শন করেন। সন্ধ্যায় আগুনের উপর দিয়ে সন্ন্যাসী ও ভক্তরা হেঁটে যান, কিন্তু আগুনে কোনো ক্ষতি হয়নি। তাছাড়া চড়ক পূজার কয়েকদিন আগে সন্ন্যাসীরা সন্যাস যাপন করে বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ডাক ঢোল বাজিয়ে চড়ক পূজার গান গেয়ে প্রদক্ষিণ করেন। কর্মসচির মধ্যে আরো ছিল গৌরী নাচ, কালী নাচ, শ্মাশান পূজা প্রভৃতি।
চড়ক পূজায় দুপুর থেকেই শিব মন্দির প্রাঙ্গণে ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা উপভোগ করার জন্য শত শত নারী পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতাসহ সর্বস্তরের ভক্ত বৃন্দ সমবেত হন। সন্যাসীদের ডাকের বাজনা ও তান্ত্রিক গানের সূরে পূজা অঙ্গন মুখরিত হয়ে উঠে।
চড়ক পূজা অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা, সুমন বর্মণ, উপজেলা সহকারি (ভূমি) শিল্পী রানী মোদক, থানার প্রতিনিধি এসআই শংকর বাবু, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসক্লাব সভাপতি স্বপন কুমার বর্মণ প্রমুখ। চড়ক পূজায় ভক্তরা মানত করে হাঁস, কবুতর, পাঠা ও হরিলুট দেন।


