বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কায় অঘোষিত লকডাউনে পুরো দেশ। সেই সুবাদে জামালগঞ্জের হাটবাজারসহ শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবনও চলে গেছে হোম কোয়ারাইন্টানে। এ অবস্থার আজ রবিবার ১১তম দিন অতিবাহিত হলেও উপজেলার কর্মহীন পেটকাতুরে হতদরিদ্র্য মানুষগুলো এখন পর্যন্ত পাচ্ছে না কোন সরকারি ত্রাণ সহায়তা। সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে ইউনিয়নভিত্তিক এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যে সহায়তা দেওয়া হয়েছে তাও প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প। এ নিয়ে বেকার দরিদ্র্য অভাবী জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুঁশিয়ার করে বলেছেন, কোন মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে। কিন্তু এ উপজেলায় এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। এ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা প্রশ্ন রেখে বলতে চাইছেন, এভাবে বেকার বাড়িতে বসে না খেয়ে মরার চেয়ে, করোনা ভাইরাসে মরাই ভালো। এছাড়া সরকারের একাউন্টে ধনাঢ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কোটি কোটি টাকা যুক্ত হলেও গ্রামের সাধারণ মানুষ এখনও কোন সহায়তা পাচ্ছে না।
এ নিয়ে বেহেলী ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের বালি দিনমজুর পংকজ রায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘কাম কাজ বন্ধ থাখনে বৌ-পুলাফুরী লইয়া না খাইয়া এমনিতেই মইরা যাইমু। এর চেয়ে করোনায় মইরা যাওয়াডাই ভালা। সরকারে চাউল ডাইল দিব, এইডা খালি উইনাই যাইতাছি। আর কোন দিন দিব, মরার পরে দিলে লাভডা কিতা হইব?’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রতি ইউনিয়নে ১শ’জন গরীব দুঃস্থদের মাঝে সামান্য ত্রাণ বন্টন করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় শুধু যৎসামান্যই না, শতকরা একজন পেয়েছে কি না সন্দেহ। তাও আবার মেম্বার-চেয়ারম্যানদের ঘনিষ্ট জনরাই এতে ভাগ বসিয়েছে বলে কথা উঠেছে। এছাড়া এ উপজেলায় ব্যক্তি উদ্যোগেও কিছু ত্রাণ সহায়তা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন সচিবদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাদেরকে তালিকা প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা তালিকা প্রস্তুত করে জমা দিয়েছি। এখন কবে কতজনকে এ ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে সেটা বলা যাচ্ছে না।
তাঁরা আরও জানিয়েছেন, প্রতি ইউনিয়নে পৃথকভাবে প্রায় পনেরো’শ থেকে আড়াই হাজারেরও উপরে শ্রমজীবী বেকার মানুষের নাম তালিকাভুক্ত করে তারা জমা দিয়েছেন। এদের মধ্য থেকে ঠিক কতজনকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে তা জানা যায়নি।
করোনা ভাইরাসে গৃহবন্দী জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের উত্তর কামলাবাজ গ্রামের বাসিন্দা ও কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা খুব করুণ। এদের মধ্যে চরম হতাশা ও অস্বস্তি কাজ করছে। সব বন্ধ থাকায় তারা কেউ কাজে যেতে পারছে না। ফলে অনেকটা অসহায় অবস্থায় দিন পার করছে তারা। তাই দ্রুত ত্রাণ তৎপরতা চালানো প্রয়োজন।’
সাচনা বাজার ইউনিয়নের হরিহরপুর গ্রামের হোমিও চিকিৎসক ডা. বিষ্ণুপদ সূত্রধর বলেন, ‘দেশ একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার চেয়েও বড় ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। যারা এখন গৃহবন্দী, কাজে যেতে পারছে না। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোর বিপাকের মধ্যে আছে। শুনেছি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সরকারি তহবিলে প্রচুর অর্থ জমা হচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না। এতে করে হতদরিদ্র্য মানুষেরা পেট বাঁচাতে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করবে। এ ব্যাপারে সরকারের দ্রুত মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া সাধারণ মানুষের মাঝে যে ত্রাণ বন্টন করা হবে সেগুলো যেন কোন অনিয়ম ছাড়া সুষ্ঠুভাবে বন্টন করা হয় সেদিকে নজর দেওয়া দরকার।’
এ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘প্রতি ইউনিয়ন থেকে যে তালিকা এসেছে আমরা এর মধ্য থেকে ২ হাজার ৭০০ মানুষের নাম বাছাই করেছি। বাছাইকৃতদের এ সপ্তাহে ১০ কেজি চাল ও ২ কেজি করে আলু দেওয়া হবে। এর আগে ৬৪০ জনকে এ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পরে বাকিদের ধারাবাহিকভাবে এ সহায়তা প্রদান করা হবে।’


