আকবর হোসেন, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। গেল কিছুদিন ধরেই উপজেলা প্রশাসনের নিকট হাওরের বাঁধের কাজ পেতে কয়েকশত আবেদন জমা পড়েছে। শুধু মৌখিক ভাবেই নয় কাগজে কলমেও সুপারিশ চলছে।
উপজেলা প্রশাসন ছাড়াও উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যদের কাছে নানান তদবির শুরু হয়েছে। উপজেলা সদর ও প্রধান বিপণীকেন্দ্র সাচনা বাজারের বিভিন্ন দোকান, চায়ের স্টল, অফিস পাড়ায় শুধু একটিই আলোচনা চলছেÑ কে পাচ্ছে কোন বাঁধের কাজ, কোন হাওরে কাদের বেশী কাজ।
ঠিকাদারী প্রথা উঠে যাওয়ায় উপজেলার প্রধান দুটি হাওর পাগনার ও হালির হাওর ছাড়াও মহালিয়া, শনির, হাওর, মিনি পাগনার, ছন্নার হাওরসহ বিভিন্ন বাঁধের কাজ বাস্তবায়নে পিআইসিতে অর্ন্তভুক্তি ও কাজ পেতে নানান তদবির লবিং শুরু হয়েছে বেশ জোরেসোরে।
বিশেষ করে হাওর আন্দোলনের নেতারা কাজের জন্য তদবির করাতে বিষয়টি উপজেলা সদরে আলোচনা হচ্ছে বেশী।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তদবির লবিং করলেও উপজেলা প্রশাসন এসব গুরুত্ব ও আমলে নিচ্ছেন না। স্বচ্ছতার মাধ্যমে তারা প্রকৃত কৃষকদের দিয়েই পিআইসি গঠন করবেন বলে জানিয়েছেন।
গেল ৪ ডিসেম্বর দিনের বেলায় উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে হাজারো মানুষের সমাগম থাকায় সন্ধ্যার পরে উপজেলা পরিষদে আবেদন গুলির যাচাই বাছাইয়ের কাজ হয়। পরবর্তীতে ৬ ডিসেম্বর বুধবার
উপজেলা কাবিটা প্রণয়ন, তদারকি ও বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উপজেলার হালির হাওর, পাগনার হাওর, মহালিয়ার কয়েকটি পিআইসি প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হয়।
তবে গত বছরের হাওরের রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির সাথে জড়িত অভিযুক্ত দুদকের আসামী বেহেলীর ইউপি সদস্য মনু মিয়ার বড় ভাই সামছু মিয়া ও আপন ভাগনে গউছ মিয়া, দুদকের মামলার অন্য আসামী বেহেলীর আরেক ইউপি সদস্য আবু সুফিয়ানের পিতা আব্দুস সালাম কাজ পেয়েছেন শুনে এলাকার কৃষকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ও তাৎক্ষণিক বিষয়টি গণমাধ্যম ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের জানানো হয়।
দুদকের মামলার আসামী ও তার পরিবারের কাউকে পিআইসির সদস্য না করার জন্য বেহেলী ইউনিয়নের কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন। এই নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংবাদও প্রকাশিত হয়।
বিশেষ করে উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও তদারকি কমিটির কতজন সদস্য কাজ পাচ্ছেন তাও উপজেলায় আলোচিত হচ্ছে।
উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ও মৎস্যজীবি প্রতিনিধি জানকী দেবনাথ, কৃষক প্রতিনিধি ফেনারবাঁক ইউনিয়নের পাগনার হাওরের খলিলুর রহমান, গণমাধ্যম প্রতিনিধি দৈনিক যুগান্তরের জামালগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমানও জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের পিআইসির অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে জানা যায়।
এই নিয়ে হাওরপাড়ের কৃষকদের মন্তব্য, যারা তদারকিতে আছেন তারাই যদি প্রকল্প চেয়ারম্যান বা কমিটিতে থাকেন তাহলে নানান সমস্যা ও সমালোচনা হবেই।
কৃষকদের দাবি আদায় নিয়ে গঠিত হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন ও হাওর বাঁচাও জামালগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন কমিটির বিভিন্ন ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দও হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ পেতে আবেদন ও তদবির করে যাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
জান যায়, হালির হাওরের বেহেলীতে হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক প্রদীপ কুমার মজুমদার, বেহেলী ইউনিয়ন শাখার আহবায়ক আমিনুল হক মনি, সদস্য সচিব আবুল হোসেন, সদস্য আয়না মিয়া, শামসু মিয়া, আ. বাকির, কোহিনুর, ছাদরুল আমিন প্রমুখ বিভিন্ন পিআইসেতে নাম লিখাতে চান।
একইভাবে হাওর বাঁচাও জামালগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক রাধানগরের জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা কমিটির সদস্য রাধানগরের জয়নাল মিয়া, আব্দুল মন্নান, আব্দুল মোচ্ছাব্বির, আফিল মিয়াও পিআইসিতে অন্তর্ভূক্ত হতে জোর চেষ্টা তদবির চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
অবশ্য হাওর আন্দোলনের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দের দাবি আন্দোলনের কেউ কমিটিতে গেলে অবশ্যই তার পদ থেকে পদত্যাগ করে যেতে হবে অন্যথায় তাকে বহিস্কার করা হবে।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের বেহেলী ইউনিয়নের আহবায়ক আমিনুল হক মনি বলেন,‘ আমি পিআইসির সভাপতি বা সেক্রেটারী হব না, আমার বাবা হবেন। আমি কমিটিতে সদস্য থাকব, আমাদের সদস্য সচিব আবুল হোসেন, প্রদীপ কুমার মজুমদার মিনু, আয়না মিয়া, শামসু মিয়া, জামাল মিয়া ও আরো কয়েকজন কমিটিতে থাকবেন।’
হাওর বাঁচাও জামালগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহবায়ক গুল আহমদ বলেন,‘আমরা প্রথম থেকেই জানিয়েছি; আন্দোলন আর সুবিধা এক সাথে হতে পারে না। আমাদের একজনও পিআইসি কমিটিতে থাকতে পারবে না। কেউ কমিটিতে যেতে চাইলে তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে হবে, অন্যথায় বহিস্কার করা হবে।’
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহবায়ক অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন,‘ হাওরের বাঁধ নির্মাণ, নদী খননসহ সংশ্লিষ্ট কাজ স্বচ্ছতার মাধ্যমে হচ্ছে কিনা আমরা তা মনিটরিং করব। আমাদের সংগঠনের কারও পিআইসির সদস্য হওয়ার সুযোগ নেই। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে; যারা পিআইসির সদস্য হতে চান তাদেরকে অবশ্যই সংগঠন থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। না হলে জেলা কমিটি তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে দিবে।’
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন তদারকি কমিটির সভাপতি মো. শামীম আল ইমরান বলেন,‘ গত বছরের হাওরে বাঁধ দুর্নীতির সাথে জড়িত কাউকে এবার পিআইসিতে রাখা হবে না। উপজেলা কমিটি স্বচ্ছতার মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে পিআইসির সদস্য মনোনীত করবে। গত সপ্তাহের সভায় উপজেলার কয়েকটি হাওরের কিছু সংখ্যক পিআইসি মনোনীত করা হয়েছ। বাকীগুলো দ্রুত বাছাই করা হবে।’


