বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে এখনও শুরু হয়নি হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ। গঠন করা হয়নি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)। ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও হাওরে পানি থাকায় কাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী সপ্তাহেই পিআইসি গঠন এবং হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ উদ্বোধন করা হবে। কিন্তু বাঁধের বিষয়ে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন উল্টো কথা। তাদের দাবি, হাওরে পানি থাকলেও অধিকাংশ বাঁধ এলাকা শুকিয়ে গেছে। তাই কাজ এগিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হবে না। এছাড়া হাওর থেকে পানি নামার খালগুলো পুনঃখনন করা জরুরী বলে জানিয়েছেন তারা।
এ উপজেলায় পৌষের প্রথম সপ্তাহ থেকে ধান রোপণের কাজ প্রায় শুরু হয়ে যায়। আর পৌষের মাঝামাঝিতে এসে কৃষক পুরোদস্তুর ধান রোপণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ চলে গেলেও এখন পর্যন্ত উপজেলার ৭টি হাওরের কোনটিতে পুরোদমে রোপণ কাজ শুরু করতে পারেননি কৃষক।
উপজেলার সবচেয়ে বড় দুই হাওর হালি ও পাগনা এখনও পানিতে নিমজ্জিত। হাওরের তীরবর্তী কিছু অংশ ভেসে উঠলেও অধিকাংশ জমি পানিমগ্ন থাকায় কৃষক যেমন চাষাবাদের কাজ শুরু করতে পারছে না তেমনি যথাসময়ে বাঁধের কাজে হাত দেওয়া সম্ভবপর হচ্ছে না। সরেজমিন এমনটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাশাপাশি হাওরে পানি লেগে থাকার বিষয়টিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দায়সারা গোছের কাজই দায়ী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পাগনা হাওরের গজারিয়া স্লুইচ গেইট ও তার পার্শ্ববর্তী অংশ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, এ হাওরের পানি স্লুইচ গেইট দিয়ে সুরমা নদীতে এসে পড়ছে। তবে চাষ উপযুক্ত জমি ভেসে উঠতে যতটুকু পানি অপসারণের কথা সেটুকু হচ্ছে না। স্লুইচ গেইট থেকে যে খালটি পাগনা হাওরে গিয়ে মিশেছে সেই খালের মাঝে মাঝে চর জেগে পানি অপসরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে হাওরের অপর প্রান্তের ঢালিয়া স্লুইচটিও সে রকম পানি টানতে পারছে না। পাগনাকে দু’ভাগে বিভক্ত করা কানাইকালী নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওরের পানি সরতে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। যে কারণে পাগনার পানি শুকাতে বিলম্ব হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও গজারিয়া বাসিন্দা আলী আহমদ জানান, ‘পাগনা হাওরের পানি এই স্লুইচ গেইট দিয়ে নদীতে এসে পড়ে। পানি নামার এ খালটিতে মাঝে মাঝে চর পড়ে গেছে। গত বছর স্থানীয় মানুষের পরামর্শ কিংবা সহযোগিতা না নিয়ে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা নামকাওয়াস্তে খনন কাজটি করেছে। স্থানীয়দের গুরুত্ব দিয়ে যদি সেটি করা হতো তাহলে হাওরে এখন পর্যন্ত এতো পানি থাকত না।’
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের ফেনারবাঁক ইউনিয়ন সভাপতি মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘হাওর থেকে পানি নামার এই গুরুত্বপূর্ণ খালটি খোদাইয়ে সরকার যে বরাদ্দ দিয়েছে সে অনুযায়ী খনন কাজ হয়নি। এটি সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত ও দায়সারাভাবে খনন করা হয়েছে। খননের মাটি তীরে ফেলায় সেই মাটি আবার খালে এসে পড়ছে এবং তাতে চর জেগে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের পরামর্শ নিয়ে এটি আবার পুনঃখনন করা জরুরী।’
স্থানীয় কৃষক গজারিয়া গ্রামের আলী উসমান (৬৫) বলেন, ‘এইডা ভালো কইরা খোদাই করা দরকার। যে দিক দিয়া পানি নামবো এই খালটাই যদি টান (চর) থাকে তাইলে তো হাওর ভর্তি পানি থাকবই। সময় মতো পানি না নামলে আমরা কই চাষাবাদ করমু।’
হালির হাওর পাড়ের কৃষক জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের কালীপুর গ্রামের আমজাদ আলী জানিয়েছেন, ‘হাওরে পানি থাকলেও চারপাশ শুকিয়ে গেছে। তাই বাঁধের কাজ শুরু করতে কোনো সমস্যা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক সময়ে হাওরকে জাগিয়ে তুলতে হলে পানি যাওয়ার নালাগুলো প্রতি বছর খনন করতে হবে। তবে স্থায়ীভাবে ব্যবস্থা নিতে পারলে আরও ভালো হতো। তাতে করে দ্রুত পানি নেমে পড়বে এবং সময় মতো চাষ করে ধান রোপণ করা সম্ভব হবে।’
উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ সহকারী প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, ‘গত বছর গজারিয়া খালের প্রায় ৪ কিলোমিটার খননের জন্য ২ কোটি ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খননের কাজ ঠিকমতো হয়নি বিধায় সম্পূর্ণ টাকা ছাড় দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে বেশ ঝামেলা হয়েছে।’
অপরিকল্পিত কাজ ও দুর্নীতিই হাওরে পানি লেগে থাকার অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। হাওরে পানি যাওয়ার রাস্তাগুলো চিহ্নিত করে তা স্থায়ী খোদাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। পাশাপাশি স্থানীয়দের আমলে নিয়ে হাওরে যে স্লুইস গেইটগুলো আছে সেগুলোর পানি নিষ্কাশিত রাস্তা পুনঃখননের মাধ্যমে হাওরকে পানিমুক্ত করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে হাওর পাড়ের মানুষ।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘স্লুইচ গেইটের পুনঃখননের কাজ দ্রুত সময়ে করা সম্ভব হবে না। সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কথা বলে পরবর্তীতে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করব। আর আগামী সপ্তাহের মধ্যে পিআইসি গঠন করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’


