জামালগঞ্জে বিদ্যুতায়িত হয়ে ২ জনের মৃত্যু- এই দায় কার?

জামালগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গত রবিবার ঝুমা দাস ও দ্বীপ সরকার নামের মা ও ছেলের করুণ মৃত্যু ঘটেছে। ওই দুর্ঘটনায় ঝুমার মেয়ে পূজা সরকার গুরুতর আহত হয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, কলতলায় স্নান করার সময় বিদ্যুতায়িত তার ছিড়ে তাদের উপরে পড়ে। ঘটনাস্থলেই বিদ্যুস্পৃষ্ট হয়ে ঝুমা ও দ্বীপ মৃত্যুবরণ করে। পাশেই অবস্থান করা ঝুমার ৭ বছর বয়সী মেয়ে পূজাও গুরুতর আহত হয়। জামালগঞ্জ উপজেলা সদরের তেলিয়া আবাসিক এলাকার ঘটনা এটি। এরকম মর্মান্তিক মৃত্যু কিছুতেই মেনে নেয়ার মত নয়। এখানে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতিই এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য দায়ী। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর খবর মাঝে-মধ্যেই সংবাদপত্রে প্রচারিত হতে দেখি আমরা। কিন্তু কিছুতেই এমন দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু আটকানো যাচ্ছে না। সরকারের সদিচ্চা ও আন্তরিক চেষ্টায় সারা দেশ বিদ্যুতায়িত হচ্ছে। গ্রামের কোণে কোণে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। এখন দাবি করা হয় দেশ শতভাগ বিদ্যুতায়িত। এরকম এক যুগান্তকারী অর্জনকে ফ্যাকাশে করে দেয় এমন অনাহুত মৃত্যু। উন্নয়নের সাথে যদি মৃত্যু বা দুর্ঘটনা ঝুঁকিও সমান্তরালভাবে সামনে চলে আসে তখন আসলে উন্নয়নের মহিমা কমে যায়। একটু সতর্ক চোখ বুলালেই বুঝা যায় জামালগঞ্জের বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর পিছনে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুত বিভাগের দায় সবটুকো। বিদ্যুৎ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তরঙ্গ বিশেষ। বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসা মাত্র যেকোনো প্রাণীর মৃত্যু অবধারিত। তাই বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনগুলোর বিষয়ে অতিশয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সঞ্চালন লাইনের একটি অংশের তার ঝুলে থাকবে আর মানুষের উপর পড়ে যাবে এমন কথা চিন্তা করাও অন্যায়। কিন্তু বাস্তবে এমনই ঘটেছে। এটি পরিস্কারভাবে জামালগঞ্জের বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিজনিত দায় নিশ্চিতভাবেই। এজন্য তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।
মানুষের প্রাণ অমূল্য। আর সেই প্রাণ যদি হয় ঝুমার মতো ৩৫ বছরের তরুণী আর দ্বীপের মতো ২ বছরের শিশু সন্তান তখন তার মূল্য অনিরূপণযোগ্য। কিন্তু যদৃচ্ছা চলতে অভ্যস্ত এই দেশে এই প্রাণঘাতী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা বিভিন্ন কৌশলে দায়মুক্তি পেয়ে যান। দায়মুক্তি পেয়ে যায় বলেই তথাকথিত দুর্ঘটনা (যা আদতে মৃত্যুকূপ তৈরি করে রাখার নামান্তর) জনিত মৃত্যুর জন্য এ দেশে কখনও কাউকে দায়ী করা হয় না। হলেও নানা কায়দা কানুন করে দায়ীরা বেমালুম নিজেদের নিরাপদ করে ফেলতে সক্ষম হয়। অথচ সভ্য দেশে এরকম মৃত্যুর জন্য সারা দেশ তোলপাড় করা হয়ে যেত। ঝুমা ও দ্বীপের মৃত্যুর জন্য তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোন আইনী প্রতিকার চাওয়া হয়েছে কি-না কিংবা এজন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে কি-না আমরা জানি না। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে না হলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুত বিভাগের পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার এক ধরনের প্রত্যাশা আমরা করি। আমরা মনে করি বিদ্যুৎবিভাগ এর দায় গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে তাদেরই সেবাসক্ষমতা বাড়বে, কর্মীদের দায়সারা কাজের পরিমাণ কমবে, সর্বোপরি তাদের দ্বারা অমূল্য প্রাণ হানির মতো দুঃখজনক ঘটনাগুলোও হ্রাস পাবে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে এইটুকো মানবতা ও দায়িত্ববোধ দেখানো তাদের উচিৎ। বিদ্যুত বিভাগ কি সেই দায়িত্ব পালন করবে?
ঝুমা ও দ্বীপের মৃত্যুর জন্য তার পরিবারকে শান্ত¡না জানানোর কোন ভাষা আমাদের জানা নেই। আমরা কেবল দুঃখ প্রকাশ করতে পারি। আর যা করতে পারেন তারা হলেন বিদ্যুৎবিভাগসহ আইনী কর্তৃপক্ষ। আমরা চাইব ওই বিভাগগুলো এই দুর্ঘটনার বিষয়ে তৎপর হোন এবং যাদের গাফিলতির জন্য দুইটি তাজা প্রাণ ঝরে গেলো তাদের শাস্তি নিশ্চিত করুন। চিকিৎসাধীন পূজা সরকারের আশু আরোগ্য কামনা করি।