জিপি-৫ পেলেও এখন কি করবে জানেনা প্রিয়াংকা

বিশেষ প্রতিনিধি
দুই বছর আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মা (প্রতিভা রানী দাস) মারা গেছেন। দিনমজুর বাবা ছোট ভাইকে নিয়ে রাজধানী ঢাকায় শরীর খাটানোর কাজ করছেন। অদম্য মেধাবী মেয়েটিকে রিক্সা চালক (নিরঞ্জন দাস) মামার বাড়ি রেখে গেছেন বাবা। রোববার সকাল থেকেই মেয়েটি দুশ্চিন্তায় ছিলো, এইচএসসি পাস করে কি হবে, কি করবে, এমন ভাবনা ভর করেছিল তাকে। পড়াশুনা হবে কি না জানা নেই মেয়েটির। সংগ্রামী এই শিক্ষার্থীর নাম প্রিয়াংকা রানী দাস। সুনামগঞ্জের শাল্লা ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়পুর গ্রামের দিনমজুর সুনীল দাসের মেয়ে সে।
বাবা সুনীল দাশ বছরের কিছু সময় বাড়িতে থেকেই ছেলেকে নিয়ে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন। আবার এলাকায় কর্মহীন হলে রাজধানী ঢাকায় কাজের সন্ধানে ছুটেন তিনি। মেয়ের ফলাফল সুনীল দাস শুনেছেন ঢাকা থেকেই।
সুনীল দাসের মুঠোফোনে রোববার বিকালে ফোন দিলে তিনি কয়েকবার ফোন কেটে দেন, এক সময় ফোন ধরার পর পরিচয় দিতেই বললেন ‘কামও আছি ভাই, ফোন ধরলে অসুবিধা অইবো।’ অনেক চেষ্টা করে তার সঙ্গে এক দুই মিনিট কথা বলার সময় তিনি বললেন, ‘মেয়েটি ফোন দিয়া কইছে এ প্লাস পাইছে।’ এখন কি পড়াবেন জানতে চাইলে বললেন, ‘দেখি আশপাশের মানুষের লগে পরামর্শ কইরা।’ এরপরই ফোন ছেড়ে দেবার কথা জানিয়ে বললেন, ‘পরে মাতমুনে ভাই।’
প্রিয়াংকা জানালো, পাহাড়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে বৃত্তি পেয়েছে সে। একইভাবে পাহাড়পুর বসন্ত কুমার পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে বৃত্তি পায়। ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেবার পর ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মায়ের মৃত্যু হয়। সেই থেকে বাবা ভাইসহ তিন জনের সংসারের রান্না বান্নার কাজ করে কয়েকটি টিউশনিও করেছে সে। কলেজ খোলা থাকলে দেড় ঘণ্টা পায়ে হেঁটে শাল্লা উপজেলা সদরে গিয়ে ক্লাস করেছে। একইভাবে বাড়ি থেকে শাল্লা উপজেলা সদরে গিয়ে প্রাইভেটও পড়েছে।
প্রিয়াংকা বললো, শাল্লা উপজেলা সদরে যেতে অপেক্ষা করলে অটোরিক্সা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিদিন ভাড়া দিয়ে যাবার মতো সামর্থ নেই আমাদের। কলেজের স্যাররা টিউশন ফি নেন নি তার কাছ থেকে। এজন্য স্যারদের কাছে পড়া সম্ভব হয়েছে জানিয়ে স্যারদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানালো সে।
প্রিয়াংকা বললো, পরীক্ষার ফলাফল শুনে খুশি হয়েছি, কিন্তু কি করবো, পড়শুনা করতে পারবো কি-না কিছুই আমি জানি না।
পাহাড়পুর গ্রামের সম্মানীয় ব্যক্তি রতি কান্ত সরকার। বললেন, কেবল পাহাড়পুর নয়। আশপাশের গ্রামেরও কেউ এতো সগ্রাম করে পড়াশুনা করে নি। এতো ভালো ফলও করে নি। দারিদ্রতা ইচ্ছাশক্তিকে হারাতে পারে না, বুঝিয়েছে প্রিয়াংকা।
শাল্লা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক তরুণ কান্তি দাস বললেন, মেয়েটির ফলাফল শুনে কলেজের শিক্ষকরা আবেগাপ্লুত হয়েছেন। শিক্ষকরা বলেছেন, কঠিন সংগ্রাম করে পড়াশুনা করেছে মেয়েটি। সামান্য সহযোগিতা পেলে এই মেয়েটি অনেক ভালো কিছু করতে পারবে।