জীবনের ন্যুনতম নিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে

দোয়ারাবাজারে নিহত ২, আহত ৫০। জগন্নাথপুরে গুলিবিদ্ধ ৩৭ জন। ছাতকে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০। গতকাল প্রকাশিত দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের ভিন্ন ভিন্ন তিন সংবাদের শিরোনাম এগুলো। শনিবার জেলার তিন স্থানে সংঘর্ষে অন্তত ২ ব্যক্তি নিহত হওয়াসহ ৯৭ জন আহত হয়েছেন। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় হিং¯্রতার শিকড় কতোটা গভীরে গেড়েছে আলোচ্য সংবাদগুলো এর প্রমাণ। যেসব সংঘর্ষ হয়েছে এর পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করলে নিতান্তই তুচ্ছ কিছু বিষয়াদির খবর পাওয়া যায়। দোয়ারাবাজার ও জগন্নাথপুরের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পিছনে পূর্ব বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের কিছু আলামতের দেখা মিলে। ছাতকের ঘটনাটি অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ। এমনসব কার্যকারণের ফলে কারও প্রাণ চলে যাবে, আহত হয়ে পড়ে থাকবে আরও প্রায় এক শ’ মানুষ, আমাদের এই সমাজটি কোথায় এগিয়ে চলেছে? আসলে আমরা কি চরম অসহিষ্ণু জাতিতে পরিণত হচ্ছি ক্রমশঃ?
একটি সমাজ যখন এমন হিং¯্র মনোভাব দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যায় তখন এর রাশ টানতে পারত আইনের সুষ্পষ্ট প্রয়োগ। সমাজের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা তথা ব্যক্তি ও সমাজের ভিতরকার দানবীয়তাকে রুখতেই আইন ও আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভব ঘটেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে কাল নিরবধি। এই মানবসমাজের পায়ে আইনের শিকল বাঁধা না থাকলে সমাজের চেহারাটি কেমন হত তা ভাবা যায় না। কিন্তু আইনের শিকল বাঁধা অবস্থায়ও কেন মানুষের সমাজে আজ এত সহিংসতা, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজা ভীষণ জরুরি।
তুচ্ছ কারণে মানুষ অন্য মানুষের জীবন ছিনিয়ে নেয়। একটি মুরগি চুরি করার মতো কারণেও মানুষের প্রাণ যায়।  অর্থাৎ কিনা একটি মুরগির দামের চাইতেও মানুষের জীবনের দাম কম। অথচ মানুষকেই বলা হয়ে থাকে আশরাফুল মখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। সমাজের এই বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে নানা ধরনের কার্যকারণের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে। সবচাইতে বড় কারণ বোধ করি অর্থনৈতিক। আধিপত্য বিস্তারের যে কথা বলা হচ্ছে জগন্নাথপুরের সংঘর্ষের কারণ হিসাবে, এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পিছনেও নিশ্চয়ই শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বিষয়াদিই কাজ করে থাকবে। ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে বা এক পক্ষের সাথে অন্য পক্ষের যে বিরোধ সেখানেও কোন না কোন ভাবে এমন অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই জড়িত। সহসা এমন অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সহনীয় অবস্থা বজায় রাখতে আইন ও আইনী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ সক্রিয়তা জরুরি।
দোয়ারাবাজারে শেরুজ্জামান ও এবাদুল হক মৃত্যুবরণ করে নিজেরা যাবতীয় জাগতিক জটিল হিসাব-নিকেশের বাইরে চলে গিয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা জীবিত রয়েছি তাদের তো জীবনের ন্যুনতম নিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। আর এই বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে হবে রাষ্ট্র, আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেই। এই নাগরিক চাহিদাটুকুকে বিবেচনায় নিয়ে হত্যাকারীদের প্রতি আইনের শক্ত পদক্ষেপ কামনা করছি আমরা। জানা কথা, এই হত্যাকারী বা সংঘর্ষকারীরা যদি ধরাছুঁয়ার বাইরে চলে যায় তাহলে মানুষের সমাজে তারা আরও হি¯্রংতা ছড়াবে। তখন শেরুজ্জামান ও এবাদুল হকের মতো করুণ মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ নিতে হবে আমাদের আরও কোন না কোন স্বজনকে।