জীবন সায়াহ্নে মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী

আকরাম উদ্দিন
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এই মাসে বেশি মনে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস জানতে ভাল লাগে আমার। তাই মনের আবেগে বুধবার সকালে অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা (যুদ্ধাহত) রজব আলীকে দেখতে যাই সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহীমপুর গ্রামে। বয়স প্রায় ৭৫ বছর। দীর্ঘ ৮ বছরে দুই বার স্ট্রোক করার কারণে শারীরিক অসুস্থতায় এখন শয্যাশায়ী তিনি। ঘরেই কাটে মাস আর বছর। আমার উপস্থিতিতে নড়ে চড়ে উঠে বসলেন বিছানায়। অসুস্থ শরীর বিষন্ন মন। বললাম কেমন আছেন, ভাল। দেখতে এসেছি আপনাকে। হ্যাঁ বসুন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এসেছি। মৃদু হাসলেন রজব আলী। চাদর টেনে গায়ে জড়িয়ে স্ত্রীকে চায়ের কথা বললেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার কথা বলায় যেন হঠাৎ তারুণ্যের চেতনা জাগ্রত হয়েছে তাঁর শরীরে।
যুদ্ধে যেতে কীভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন :
বীর মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী বললেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে যখন সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ছুটে চলেছে তখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীও সুনামগঞ্জে এসে পৌঁছেছে। শহরের পুরান সার্কিট হাউসে হানাদার বাহিনী আস্তানা গেড়েছে। দিনটি ছিল সোমবার সকাল। আমি তখন শহরের ষোলঘর এলাকায় আমার বোনের বাসায় হেঁটে যাচ্ছিলাম। সার্কিট হাউসের সামনে দিয়ে যাবার সময় পাক বাহিনীর দিকে তাকিয়ে রাস্তায় চলছিলাম। হঠাৎ ২/১জন পাকসেনা আমাকে লক্ষ করে ডাক দেয়। তারা অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত। আমি এগিয়ে যাই। কাছে গেলে এক পাক সেনা আমাকে বলে কলিমা বাতাও। আমি কলিমা বললে কিছু অংশে ভুল হয়ে যায়। তখন একজন রেগে গিয়ে আমার গালে সজোরে থাপ্পর মারে। শুদ্ধ করে শেখার জন্য বলে এবং ধমক দেয়। গালে হাত রেখে আমি ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে আসি।
এই ঘটনায় আমি ক্ষোভে ফেটে পড়ি। বাড়িতে এসেই জামা-কাপড় নিয়ে নিরবে বেরিয়ে পড়ি। ওইদিন আমি সোজা চলে যাই ভারতের বালাটে আলফাত উদ্দিন মুক্তার সাহেবের কাছে। মুক্তিযুদ্ধে যাবার কথা বলায় আমাকে ভারত মেঘালয়ের ইকো-১ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে পাঠানো হয় তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরে। এই ট্যাকেরঘাটে অবস্থান করে তাহিরপুর ও জামালগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করি আমি। পরবর্তীতে বালাট সাব-সেক্টরের মেজর মোতালিবের অধীনে সদর উপজেলা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি।
১ম ঘটনা
বীর মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী বললেন, আমি ট্যাকেরঘাট সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর মোসলেহ উদ্দীনের অধীনে যুদ্ধ করেছি ৩ মাস। প্রথম দিকে এই সাব-সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। একদিন সকালে আমার সহযোদ্ধা তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট এলাকার বাসিন্দা মোজাহিদ মিয়া, জামালগঞ্জের বাািসন্দা আব্দুল লতিফ, সদর উপজেলার অক্ষয়নগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিমকে সাথে নিয়ে জামালগঞ্জের খাদ্য গোদাম এলাকায় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হই। এ সময় এক পাঞ্জাবীকে বুলেটের আঘাতে মারতে সক্ষম হই আমরা। তখন ওই পাঞ্জাবীর চাইনিজ রাইফেলের গুলির আঘাত এসে লাগে আমার দুই পায়ের হাঁটুর নিচে। আমি গুরুতর আহত হই। আহত অবস্থায় তবুও গুলি ছুঁড়তে থাকি আমি। যুদ্ধ থেমে গেলে আমি বড়ছড়া এলাকায় ফিরে আসি এবং ডাক্তার হারিছ উদ্দিন সাহেবের কাছে চিকিৎসা নিই। যুদ্ধকালীন সময়ে অতি স্মরণীয় এই দিনটি ছিল ৮ আগস্ট।
২য় ঘটনা
মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী বললেন, বালাট সাব-সেক্টরের অধীনে থাকা অবস্থায় আমি সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করি। তখন আমার সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মোতালিব। একদিন সদর উপজেলার বেরীগাঁওয়ে গিয়ে পাঞ্জাবীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকি আমি ও সহযোদ্ধারা। আমাদের গুলির আঘাতে এ সময় আরেকজন পাঞ্জাবী মারা যায়। ঘটনাটি ছিল জুন মাসের মাঝামাঝি। ওইদিনের যুদ্ধ শেষে ফিরে আসি বালাট সাব সেক্টরে।
৩য় ঘটনা
মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী বললেন, যুদ্ধকালীন সময়ের প্রথম দিকে সুরমা নদী থেকে পাক বাহিনীর খাদ্য সামগ্রীর জাহাজ আটক করার ঘটনায় আমিও যুক্ত ছিলাম। পরে এই জাহাজ ট্যাকেরঘাট নিয়ে যাওয়া হয়। দেশ স্বাধীনের পর মালামাল বিক্রি করে এই টাকা দিয়ে ‘মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়।
এভাবে যুদ্ধকালীন সময়ে অনেক স্মরণীয় ঘটনা আছে যা বলে শেষ করা যাবে না। জীবন বাজি রেখে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করেছি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মাসে ৫শত টাকা করে ভাতা দিয়েছেন। পরবর্তীতে ২ হাজার টাকা করা হয়েছিল এই ভাতা। এখন হয়েছে ৩০ হাজার টাকা করে। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা পাচ্ছেন বর্তমানে ১২ হাজার টাকা করে।
বর্তমান জীবিকা :
যুদ্ধাহত হিসাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী প্রতি মাসে ভাতা পাচ্ছেন ৩০ হাজার টাকা করে। পরিবারে তিনি ও দুই স্ত্রী, ৫ মেয়ে, ১ ছেলে, ৩ নাতি, ৫ নাতনি রয়েছে। এই ভাতার টাকা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষন এবং লেখাপড়া চলে। এমনকি নিজের চিকিৎসা খরচও করছেন ভাতার এই টাকা থেকে।
পারিবারিক সমস্যা :
পরিবারে এক নাতি শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন না বলে জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা রজব আলী। তিনি জানান, ব্যাংকে ৫ লাখ টাকা ঋণ আছেন। মানুষ ঋণ পায় আরও দেড় লাখ টাকা। মেয়ে রিপা বেগম বি.এ পাশ কিন্তু চেষ্টা করেও চাকুরি পাচ্ছে না সে। নিরাপদ পানি সংকট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বাড়িতে গভীর নলকূপ নেই। ঘরে সৌর বিদ্যুৎ নেই। এসব সমস্যা সমাধানের দাবি বীর মুক্তিযোদ্ধা রজব আলীর।
কেমন বাংলাদেশ চাই :
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা রজব আলীর স্বপ্ন অনেক কষ্টে অর্জিত এই স্বাধীন দেশের রাস্তা-ঘাটের টেকসই উন্নয়ন, যানবাহনে নিরাপত্তা, বেকারত্ব দূরীকরণ, শিক্ষার অগ্রগতি, চিকিৎসার উন্নয়ন এবং সর্বোপরি দুর্নীতিমুক্ত ও শান্তি-শৃংখলার নিরাপদ বাংলাদেশ চাই।