জুবিলীর অন্তরের কান্না প্রশমন করুন

শহরের জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়টি জেলার অতি প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। জেলার শিক্ষা প্রসারে বিদ্যালয়টির অবদান অসামান্য। এই বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনান্তে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশে প্রভূত সুনামের অধিকারী হয়েছেন বহুজন। বিদ্যালয়টির ১২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে আজ থেকে ৫ বছর আগে। তখন এই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে আলো বিকিরণকারী উজ্জ্বল জ্যোতিস্কদের সমাবেশ ঘটেছিল শহরে। এখনও নিজেদের জুবিলীয়ান বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন এই বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি ফেসবুকে জুবিলীর ফ্রেমে নিজেদের কভার ফটো আপলোড করে এই প্রীতিবন্ধনের পরিচয় দিচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এত ঐতিহ্যের এত প্রাচীনত্বের এত ভালবাসার এই বিদ্যায়তনটি এখন কেমন আছে, ভিতরে ভিতরে প্রিয় প্রতিষ্ঠানটি বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে মৃত্যুবস্থায় পতিত কিনা, সেটি খোঁজ নিয়েছেন কি কেউ? কেউ কি একটি জেলার প্রধান মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির শিক্ষাদানকারী ভূমিকাকে অগ্রসর করতে নিয়েছেন সামান্য কিছু উদ্যোগ? এমন প্রশ্ন সংগত কারণেই আসে। আসে এজন্য যে বিদ্যালয়টির অনুমোদিত শিক্ষক সংখ্যা ৫২ এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৬ জন। ১৬ শিক্ষকের পদ শূন্য। বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় ক্লাসের সময় ছাত্রদের বসে থাকতে হয়। বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি ও কম্পিউটার ল্যাব প্রায় অকেজো। ওসব জায়গায় নেই কোন পরিচর্যার পরশ। এই বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ছিল সমৃদ্ধ ও বহু দুস্প্রাপ্য সংগ্রহ ছিল এখানে, প্রাচীন ব্যক্তিদের অভিমত এরকম। এখন এর অনেক কিছুই নেই। ইঁদুর-ছুঁচো খেয়ে ফেলেছে অধিকাংশ, যেগুলো আছে পুরনো কাগজের স্তূপে আটকে আছে তাও। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি, ফলাফল সবকিছুই নৈরাশ্যজনক। অন্য যেকোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় আর জুবিলীর মাঝখানে পার্থক্যরেখা টানা আজ সত্যিই কঠিন। এই হাড় জিরজিরে জুবিলীকে দেখে যারা সিকি বা অর্ধ শতাব্দী আগে এখানে পড়াশোনা করে গেছেন তারা নিশ্চিত আঁতকে উঠবেন।
আমরা শিক্ষার জন্য হা-পিত্যেশ করি বটে কিন্তু এজন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার সেগুলোর নিশ্চয়তা বিধানে সচেষ্ট থাকি না। জুবিলীকে নিয়ে আমরা শিক্ষানুরাগীরা যে উচ্চধারণা পোষণ করি, এর কাছে যে প্রত্যাশা আমাদের, সেগুলো পরিপূর্ণ করতে হলে প্রথমেই এটিকে শিক্ষা দানে সামর্থবান করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক সংকট মিটানোসহ সমস্ত ভেঙে পড়া ঐতিহ্যিক বিষয়গুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তবেই না হাত পাততে হবে শিক্ষার জন্য। নতুবা ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের কাছে কিছু চাইলে তা কি আর পাওয়া যায়?
প্রশ্ন উঠবে, সংগতও বৈকি। যা কিছু আছে, যাঁরা আছেন, তাঁরা কি সবকিছু দিচ্ছেন উজাড় করে? এর উত্তর নিশ্চিত ভাবেই, ‘না’। ‘না’ এর কিছু কারণ আর্থ-সামাজিক পরিসরে উদ্ভূত মনোজাগতিক কামনা-বাসনা, কিছু অন্যবিধ। এইসব ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ তে পরিণত করার আকাক্সক্ষাটাই জুবিলীর অন্তরের কান্না। কে বা কারা আছেন শিক্ষাবান্ধব, যিনি বা যারা জুবিলীর এই নিরব কান্নায় আপ্লুত হয়ে এগিয়ে আসবেন, একটি শতাব্দীপ্রাচীন বিদ্যাপীঠের অহংকারের পুনরুত্থানে?