আকরাম উদ্দিন, বিশ্বম্ভরপুর থেকে ফিরে
দরজির দোকানে কারিগরের কাজ করে নিজের এবং তিন ভাইবোনের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ জোগাতেন এনামুল। বহু কষ্টে, শ্রমে নিজে লেখাপড়া করেছেন, দিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষা। কদিন পরই ফল বেরুবে। আদরের ছোট বোনটাও এবার এসএসসি পাস করেছে। তাকে ভর্তি করেছেন জেলা শহরের কলেজে। সেখানে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, তাই বোনকে নিয়ে শহরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ হারাতে হলো সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র এনামুল হক (১৯) কে ।
জুয়া খেলতে বাধা দেওয়ায় নির্মমভাবে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। অভিযুক্তরাই মারধরের পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং পরে লাশ বাড়িতে পৌঁছে দেয়। শুধু তাই নয়, এখন তারা এলাকায় প্রচার করছে, এনামুল কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেছেন।
এনামুল হকের বাড়ি জেলা শহর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম জলিলপুরে। তাঁর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় কাটাখালি বাজারে বৃহস্পতিবার মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী।
পুলিশ, পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, জলিলপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী ধনপুর ইউনিয়নের কাঠাখালি বাজার। বাজারের একটি দর্জির দোকানে কাজ করতেন এনামুল। কাঠাখালি গ্রামের সাইফুল ইসলামের (৪০) সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সাইফুলের স্ত্রীকে তিনি ধর্মীয় সম্পর্কের মা ডেকেছিলেন।
গত ১৯ জুলাই রাতে এনামুল তাঁর দোকানে ছিলেন। বাজারে থাকা ধনপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে তখন আরও কয়েকজনকে নিয়ে তাস দিয়ে জুয়া খেলছিলেন সাইফুল ইসলাম। রাত নয়টার দিকে সাইফুলের স্ত্রী ফোন করে বিষয়টি এনামুলকে জানান এবং তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বলেন। এনামুল ওই ঘরে গিয়ে সাইফুলকে জুয়া খেলতে দেখে বাধা দেন এবং বাড়িতে চলে যেতে বলেন। কিন্তু তিনি এতে রাজি হননি। আরও কয়েকবার জুয়া খেলতে বাধা দেওয়ায় সাইফুল ক্ষুব্ধ হয়ে এনামুলকে মারধর শুরু করেন। এ সময় আশপাশের দোকান থেকে লোকজন এগিয়ে এলে সাইফুল কিছু হয়নি জানিয়ে এনামুলকে ধরে নিয়ে বাজারের পেছন দিকে চলে যান। 
এনামুলের চাচা আবদুন নূর জানান, বাজারের পেছনের স্কুল মাঠে নিয়ে এনামুলকেআর কয়েকজন মিলে বেধরক মারধর করেন। রাত ১০টার দিকে সাইফুল ফোন করে নূরকে জানান তার ভাতিজা বিষ খেয়েছে, তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে কাউকে পাননি। তখন সাইফুল পরে জানান তারা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। এরপর তিনিও সুনামগঞ্জে রওনা দেন। রাত ১২টায় সুনামগঞ্জ শহরে পৌঁছে সাইফুলকে ফোন দিলে তিনি নূরকে জানান তারা সিলেটে চলে যাচ্ছেন। পরে তিনি সিলেটে যেতে পারেনি। রাত সাড়ে তিনটায় সাইফুল তাকে ফোন করে বলেন, এনামুল মারা গেছেন। আবদুন নুর বলেন, ‘জুয়া খেলতে বাধা দেওয়ায় এনামুলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল।’
জলিলপুর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, এনামুলের বাবা আবদুল মান্নান (৫৫) শ্রমিক। তাঁর দুই ছেলে ও চার মেয়ে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলেদের মধ্যে এনামুল বড়। তিনি এবার সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। আরেক মেয়ে তামান্না আক্তার এবার এসএসসি পাস করে সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছেন। আরেক ছেলে জুনায়েদ হাসান জনি সপ্তম ও মেয়ে মুন্নী আক্তার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
কাটাখালি বাজারের পাশ থেকে নৌকায় জাকমা বিল পাড়ি দিলেই জলিলপুর গ্রাম। মাটির বেড়া আর টিনের চালার ভাঙাচোরা ছোট ঘর এনামুলদের। উঠানে তখন কয়েকশ নারী-পুরুষ। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল লতিফ (৬৪) বলেন, সাইফুলই সিলেট থেকে এনামুলের লাশ নিয়ে বাজারে আসেন। লাশ দেখে মনে হয়েছে ছেলেডারে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে। সারা শরীরে মারপিটের দাগ ছিল। লাশের গোসল দিয়েছেন গ্রামের আরেক বৃদ্ধ আবদুল কুদ্দুস (৫৪)। তিনি বলেন কপাল, মুখ, বুকের বাম পাশ, পায়ে আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন ছিল। ডান পায়ের হাঁটুর নিচে ও দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল ভাঙা মনে হয়েছে। গ্রামের বাসিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য গুলনাহার বলেন,‘ফুলের মত ছেলেটারে পিটাইয়া মারছে। বিষের ঘটনা পুরাটাই নাটক। আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।’ গ্রামের কলেজছাত্র জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এনামুলের একটাই চিন্তা ছিল, কীভাবে নিজে লেখাপড়া করবে এবং ভাইবোনদের মানুষ করবে।’
কাটাখালি বাজারের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের উল্টোদিকে লোকমান মিয়ার (৩৫) দরজির দোকান। এখানে আড়াই বছর কাজ করেছেন এনামুল। ঘটনার দুই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তারা লোকমানের দোকানে ছিলেন। আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে চিৎকার শুনে দৌঁড়ে গিয়ে দেখেন এনামুলকে মারধর করছেন সাইফুল। পরে সাইফুলই টেনেহিঁচরে এনামুলকে ঘর থেকে বের করে স্কুলের দিয়ে নিয়ে যান। কাঠাখালি বাজারের বাসিন্দা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আহমদ আলীও (৭৮) বলেন,‘ছেলেটা খুবই ভালো ছিল। সবাই তাঁর জন্য আফসোস করছে। এই মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছে না।’
এনামুলের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ মামলা নিতে নানা টালবাহানা করে চারদিন পার করে। এক পর্যায়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কাঠাখালি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেনজির আহমদ মানিক আপোসের প্রস্তাব দেন। এনামুলের বাবা তাতে রাজি না হওয়ায় ২৩ জুলাই রাতে হত্যা মামলা নেয় পুলিশ। মামলায় সাইফুল ইসলামসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার ১০দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বম্ভরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সহিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা আসামি ধরার চেষ্টায় আছি। হত্যা মামলার আসামি ধরার নামে তো নিরিহ মানুষকে হয়রানি করতে পারি না। মামলা নিতে পুলিশ কোনো টালবাহানা করেনি।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ মানিক বলেছেন, তিনি প্রথমে আপসের জন্য বলেছিলেন, এখন এ নিয়ে তার কোনো কথা নেই। দলীয় কাযালয়ে জুয়া খেলা হয়না। এটা শেখ রাসেল স্মৃতি পরিষদেরও কার্যালয়। এখানে নানা রকম খেলাধুলার সরঞ্জাম আছে। লোকজন বিভিন্ন সময় খেলাধুলা করে।
কথা বলার জন্য কাঠাখালি গ্রামের সাইফুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তাদের ঘরটি তালবদ্ধ ছিল।
মায়ের কান্না, বোনের আহাজারি: ছোট ঘরে পা ফেলার যেন ঠাঁই নেই। নারী-শিশুদের ভিড়। এনামুলের মা খুদেজা বেগম বলেন,‘আমার কিচ্ছু চাওয়ার নাই। ছেলেডার উছিলাতেই ঘরের সবার রিজিক হইত, তার ভাইবোনদের লেখাপড়া চলত। আমার ছেলেরে যারা পিটাইয়া মারছে তারার বিচার চাই।’ বোন তামান্না আক্তারকে নিয়েই যত স্বপ্ন ছিল এনামুলের। নিজে না খেয়ে বোনকে খাইয়েছেন। অভাবের কারণে লেখাপড়া করতে চায়নি তামান্না। কিন্তু ভাই তা হতে দেননি। তাকে কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। জেলা শহরে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এক মাসে তামান্নার কী কী জিনিস লাগবে ভাই-বোন মিলে ঘটনার দিন বিকালে তালিকা করেছেন। পরদিন সকালে তাকে নিয়ে শহরে যাওয়ার কথা ছিল এনামুলের। সেই তালিকা দেখিয়ে তামান্না আক্তার বলেন,‘আমার ভাই নাই, আমি আর লেখাপড়া করব না, শহরে যাব না। ভাইরে তুমি আমারে রাইখা কই গেলা, তোমার লগে আমারেও নিয়া যাও…।’


