জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ভেঙে নাজুক

বিন্দু তালুকদার
দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা সংস্তার ও মেরামত না করা, জেলার উপর দিয়ে সদ্য বয়ে যাওয়া বন্যা এবং গত সপ্তাহে শেষ হওয়া ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।
কোথাও কোথাও অনেক কাঁচা রাস্তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিন্তু এসব রাস্তাঘাট কবে মেরামত বা সংস্কার করা হবে তা জানেন না এলাকাবাসী। গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট ভেঙে ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হয়ে উঠেছেন রাস্তা ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় এলাকাবাসী। প্রতিদিনই রাস্তার দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্যে গালমন্দ করছেন তারা।
এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্য্যালয় সূত্রে জানা যায়, টানা বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে দোয়ারাবাজার উপজেলাধীন খাসিয়ামারা রাবারড্যাম এর উভয় পার্শ্বের এপ্রোচ সড়কসহ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুনামগঞ্জ-মঙ্গলকাঁটা সড়কে একটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বক্স কালর্ভাটসহ রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে। মঙ্গকাঁটা-নারায়নতলা সড়কে ১টি বক্স কালভার্ট (মিশনারী স্কুলের কাছে) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়কের উভয় পার্শ্বের একটি সেতুর এপ্রোচসহ সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মহেষখলা-টেকেরঘাট-লাউড়েরগড় (তাহিরপুর অংশ) সড়কে মাটির রাস্তাটি আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ী ঢলে মাটি সরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধর্মপাশা-জয়শ্রী রাস্তার ব্রীজ কালভার্টের এপ্রোচসহ রাস্তার বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দিরাই বোয়ালিয়া-মারকুলি বাজার রাস্তাও এই রাস্তায় একটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বম্ভরপুর-আনোয়ারপুর ভায়া শক্তিয়ারখোলা রাস্তায় ২টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা নদীর উত্তর পাড়ের সুরমা, রঙ্গারচর ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক     মানুষের চলাচলকারী একমাত্র রাস্তা হালুয়াঘাট থেকে ডলুরা স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত রাস্তার বেহাল দশা। গত বন্যার পানিতে ও টানা বৃষ্টিপাতের কারণে মঙ্গলকাটা বাজারের পাশে কৃষি ব্যাংকের নিকটবর্তী রাস্তা সহ বাজার এলাকার রাস্তা ভেঙে গেছে। এই রাস্তার ঘাসিগাঁও এবং কামারগাঁও এলাকায় আরো দু’টি ভাঙার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মঙ্গলকাটা আশাউড়া রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হালুয়াঘাট-ডলুরা রাস্তা গত ৪-৫ বছর ধরে বেহাল দশায় রয়েছে। এলাকাবাসী বার বার রাস্তা সংস্কারের দাবি জানালেও কোন কাজ হয়নি।
মঙ্গলকাটা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘হালুয়াঘাট-ডলুরা রাস্তা গত ৪ বছর ধরেই প্রায় ব্যবহার অনুপযোগি অবস্থায় রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে সুস্থ কোন মানুষ আসা যাওয়া করলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। রাস্তা মেরামত না করায় দিনে দিনে আরো খারাপ হচ্ছে। গত বন্যার পানিতে ও টানা বৃষ্টিতে রাস্তার আরো অনেক ক্ষতি হয়েছে।’
স্থানীয় এলাকাবাসী ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের দাবি অনুযায়ী জেলার অভ্যন্তরীণ রাস্তার সবচেয়ে বেহাল অবস্থা দোয়ারাবাজার উপজেলায়। এই উপজেলার অধিকাংশ রাস্তাই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
দোয়ারাবাজার-বাংলাবাজার-বাঁশতলা-হকনগর রাস্তা, বিট্রিশ পয়েন্ট থেকে বালিউরা বাজার হয়ে নরসিংহপুর বাজার রাস্তা, দোয়ারাবাজার-মহব্বতপুর-বোগলাবাজার রাস্তা, মহব্বতপুর- লিয়াকতগঞ্জ বাজার, দোয়রাবাজার-বাংলাবাজার-নোয়ারাই বাজার রাস্তার অবস্থা খুবই নাজুক। সামন্য বৃষ্টি হলেই এসব রাস্তায় সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। দোয়ারাবাজার- বাংলাবাজার- বাঁশতলা-হকনগর ও দোয়ারাবাজার-বাংলাবাজার-নোয়ারাই রাস্তায় খালি পায়েই হাটা যায় না। এসব রাস্তার প্রায় ৪০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ জায়গা গত ১০ বছর ধরে সংস্কার ও মেরামত করা হয় না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
দোয়ারাবাজার অটো টেম্পু, অটো রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাসুক মিয়া বলেন,‘ আমাদের দোয়ারাবাজার উপজেলার আওতাধীন সকল রাস্তা-ঘাটই ভাঙাচুরা ও বেহাল দশায় আছে গত ৫ বছর ধরে। এমন গর্ত রয়েছে যা ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত গভীর। ভাঙা রাস্তার লোহার রড বিপজ্জনক অবস্থায় বের হয়ে হয়ে রয়েছে। এতে প্রায়ই গাড়ির টায়ার নষ্ট হচ্ছে। এসব রাস্তা দিয়ে এখন কোন চালক সহজে গাড়ি নিয়ে চলাচল করতে রাজী হয়না। আবার কোথাও গেলে ভালভাবে ফেরত আসতে পারে না। গাড়ির কোন না কোন একটা পার্টস নষ্ট হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি। কোন কাজ হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ অসহনীয় দুর্ভোগ নিয়ে চলাচল করছেন। ’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাঘমারা পয়েন্ট থেকে কাটাখালী-আনন্দবাজার হয়ে সরুপগঞ্জ বাজার পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার, কারেন্টবাজার থেকে চিনাকান্তি পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার, পলাশ  থেকে ধনপুর পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার ও চালবন্দ পয়েন্ট থেকে সুরমা নদীর তীর অলিরবাজার পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তার বেহাল দশা। এসব রাস্তার কিছু কিছু জায়গা দিয়ে কোন যানবাহন নিয়ে যেতে চায় না চালকরা।
উত্তর সুরমা বিশ্বম্ভরপুর যৌথ পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. গোলাপ মিয়া ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা অটো টেম্পু, অটো রিকশা ড্রাইভারর্স ইউনিয়নের সভাপতি সাজিদুর রহমান সাজু বলেন,‘আমাদের এলাকার রাস্তা-ঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। পলাশ থেকে সরুপগঞ্জ রাস্তায় যেতে চায় না কোন চালক। রাস্তার বড়বড় গর্তের মাঝে আমরা নিজেরা মাটি ভরাট করি। কিন্তু এসব রাস্তা কবে মেরামত করা হবে তা জানা নেই আমাদের। ’
রাস্তার সংস্কার ও মেরামতের দাবিতে সোমবার ছাতকের নোয়ারাই-বাংলাবাজার ও নোয়ারাই-নরসিংপুর সড়ক অবরোধ করে পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে শ্রমিকরা। সোমবার দিনব্যাপি পরিবহন ধর্মঘট পালন করে নোয়ারাই, বাংলাবাজার ও নরসিংপুর লাইনে চলাচলকারী সকল পরিবহন শ্রমিকরা।
ধর্মঘট চলাকালে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ভাঙা সড়ক মেরামতের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। এসময় তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
বক্তারা সড়ক সংস্কারের জন্য ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন,‘দ্রুত এই রাস্তা সংস্কার বা মেরামত করে যানচলাচলের উপযোগী করে না দেয়া হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য নোয়ারাই-বাংলাবাজার-নরসিংপুর সড়কে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হবে।’
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন,‘ প্রায় একযুগ ধরে নোয়ারাই-বাংলাবাজার ও নোয়ারাই-নরসিংপুর সড়কে কোন সংস্কার কাজ করা হয় নি। ভাঙাচুরা এ সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যান চলাচল করে আসছে। প্রতিদিনই এসব সড়কে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। সম্প্রতি বন্যায় সড়ক দু’টি আরো ভেঙে গিয়ে যান চলাচলে সম্পূর্ণ অনুপোযোগি হয়ে পড়েছে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ইকবাল আহমদ বলেন, ‘টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১২০ কিলোমিটার সড়কের প্রায় ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ সদর ও দোয়ারাবাজার উপজেলায়। এছাড়া জেলার বিভিন্ন রাস্তায় কিছু ভাঙাচোরা রয়েছে। এসব রাস্তাঘাট সংস্কার ও মেরামত করার জন্য বরাদ্দ চেয়েছি। বরাদ্দ পাওয়ার পর আগামী শুকনো মৌসুমে আমরা সকল রাস্তা-ঘাটই মেরামত ও সংস্কার করব।