বিশেষ প্রতিনিধি
করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জ জেলায়। এই অবস্থায় ২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল বা সুনামগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের সামাল দেবার প্রস্তুতি খুবই কম। ৮৪ জন নরমাল করোনা রোগীকে সাপোর্ট দেবার ক্ষমতা আছে কেবল জেলা সদরের এই হাসপাতালের। রোগীর উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হলেই এই হাসপাতাল দায়িত্ব নিতে পারছে না। সংকটাপন্ন রোগীকে ৬৫ কিলোমিটার দূরের সিলেটে স্থানান্তর করা হলে, ওখানে গিয়েও সাধারণের জন্য আইসিইউ বেড পেতে সমস্যা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের করোনায় আক্রান্ত রোগীদের এমন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ডাক্তার, নার্স ও অ্যানেস্তেসিয়ানের শুন্যতাও রয়েছে হাসপাতালে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে উচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের কোন ব্যবস্থা নেই। করোনা রোগীদের সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে সিলেটে স্থানান্তর করা হচ্ছে এই কারণে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্টের কাজও চলছে মন্থর গতিতে। নির্মিতব্য প্লান্ট ৩০ জুনের মধ্যে কর্তৃপক্ষকে সমঝে দেবার কথা থাকলেও আগামী ৩ মাসেও এর কাজ শেষ হবে কি-না, এই নিয়ে সংসয় রয়েছে। অক্সিজেন প্লান্ট না হওয়া পর্যন্ত অক্সিজেনের নরমাল সিলিন্ডার (১৬৫০ লিটারের অক্সিজেন সিলিন্ডার) ছাড়া ওখানে আর কোন ব্যবস্থা নেই।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের দায়িত্বশীলরা জানান, এই হাসপাতালে বর্তমানে (রোববার পর্যন্ত) করোনা রোগী ভর্তি আছেন ৭ জন। করোনা ইউনিটে ৮৪ জন রোগী ভর্তি করার ব্যবস্থা আছে। তবে এই রোগীদের উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হলে কোন কিছুই করার নেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। সিলেটে স্থানান্তর করার পরামর্শ দেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সিলেটে বিশেসায়িত হাসপাতালগুলোতে রোগীর যে চাপ, ওখানে গিয়েও এসব রোগীর স্থান পাওয়া অনিশ্চিত। এই অবস্থায় করুণ পরিনতির দিকেই যেতে হবে যে কারোরই।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৫ টি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে। কিন্তু সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট না হওয়ায় এগুলো ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। আবার সেন্টাল অক্সিজেন প্লান্টের কাজ শেষ হলেও অ্যানেস্তেসিয়ান না থাকায় এগুলো কারা কাজে লাগাবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্তেসিয়ানের পদসহ ৪ টি অ্যানেস্তেসিয়ানের পদ আছে। কিন্তু আছেন মাত্র একজন। তাকে করোনা ইউনিটে নেওয়া হলে হাসপতালের অন্য রোগীদের কি অবস্থা হবে।
হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ কক্ষের কাজ চলমান। অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণ করে আইসিইউ কক্ষ চালু করতে কমপক্ষে ৩ মাস সময়ের প্রয়োজন বলে জানালেন একাধিক চিকিৎসক, কর্মকর্তা।
সুনামগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ জেলা সদরের ২৫০ শয্যার হাসপাতালের নানা সংকটের কথা গত ১৬ ও ৩০ জুন সংসদে উত্থাপন করে বলেছেন, ৫৯ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও ২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডাক্তার আছেন ১৫ জন। ২২৮ জন নার্সের পদ থাকলেও, আছেন ১১৩ জন। কিভাবে এই সংকটকাল মোকাবেলা করবে এই হাসপাতাল প্রশ্ন রেখে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অবহেলা এজন্য দায়ি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রোববার এই প্রতিবেদককে এই সংসদ সদস্য বলেন, আমি আগে থেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের নানা সংকটের কথা বিভিন্ন ফোরামে বলছি। আমার চেষ্টায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্টের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এটিরও যথা সময়ে কাজ শেষ হয় নি। জনবল কাঠামোরও সংকট রয়েছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে কিছুই করার থাকবে না এই হাসপাতালের।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আনিছুর রহমান রহমান রোববার দুপুরে জানালেন, হাসপাতালে ১৬৫০ লিটারের ১৮২ টি সিলিন্ডার আছে। উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের ৫ টি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে। কিন্তু এগুলো সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণের কাজ শেষ না হলে এবং অ্যানেস্তেলিয়জিস্ট না পাওয়া গেলে ব্যবহার করা কঠিন হবে। তিনি বললেন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের পেছনে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে প্রায় ৪ মাস আগে। নির্মাণ কাজ করছে রাজধানী ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইন্টার ন্যাশনাল। নির্মাণ শেষে ৩০ জুন প্লান্ট সমঝে দেবার কথা ছিল। এই প্লান্ট থেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল ভবনের সকল কেবিন, করোনা ইউনিটের ওয়ার্ড ও কক্ষে, করোনা ইউনিটের আইসিইউ কক্ষসহ প্রায় ৩০০ পয়েন্টে অক্সিজেন সরবরাহ করার কথা। ইতিমধ্যে ১৬৮ টি অক্সিজেন সাপ্লাই পয়েন্ট করার কাজও শেষ করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু লিকুইড প্লান্টের ট্যাংকি ও ম্যানুপুলেট ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আগামী এক মাসের মধ্যে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে দাবি করলেন এই কর্মকর্তা।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামছুদ্দিন আহমেদ বললেন, রোববারই শতকরা হারে সুনামগঞ্জে সর্বোচ্চ করোনা সনাক্ত হয়েছে। ৪৩ জনের করোনা টেস্টে ১৭ জনের করোনা সনাক্ত হয়েছে। এভাবে বাড়লে এবং উচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হলে সুনামগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগ বেকায়দায় পড়বে। সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন বিকল্প নেই।


