বিন্দু তালুকদার
দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠন সমূহের সুনামগঞ্জ জেলা শাখাগুলো চলছে আহবায়ক কমিটি দিয়ে। তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হওয়ায় দলীয় কাজে গতিশীলতা আসছে না। এদিকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে আগামী ১৯ নভেম্বরের জেলা বিএনপির সম্মেলন করা সম্ভব হবে না বলেও আভাস পাওয়া গিয়েছে।
একই সাথে নতুন ও তরুণ নেতৃত্ব বেরিয়ে আসছে না। কবে জেলা বিএনপি, জেলা যুবদল ও জেলা ছাত্রদলের সম্মেলন হবে তা জানেন না দলের সাধারণ নেতাকর্মী ও নেতৃবৃন্দ।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই আহবায়ক কমিটি দিয়ে চলছে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি, জেলা যুবদল ও জেলা ছাত্রদলের রাজনীতি। তিনটি সংগঠনের আহবায়ক কমিটির নেতাকর্মীদের মাঝেও চলছে গ্রুপিং-কোন্দল। গ্রুপিং নিরসণের উদ্যোগ নেয়ার পর সফলতার মূখ দেখছে না। যদিও জেলা বিএনপির কোন্দল নিরসণের বিষয়ে সিলেটে বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা গত রোববার দিনভর সুনামগঞ্জ বিএনপি’র দুই গ্রুপকে নিয়ে বৈঠক করেন।
কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দিলদার হোসেন সেলিমের সিলেট শহরের লামাবাজারের বাসভবনে সকাল ১১ টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫ টা পর্যন্ত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় সকাল ১১ টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত ফজলুল হক আসপিয়া সমর্থক অংশের বৈঠক হয়। পরে বিকাল সাড়ে ৫ টা পর্যন্ত নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। রবিবারের বৈঠকে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ একে অপরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন।
২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল জেলা বিএনপি, ১১ উপজেলা, থানা ও পৌর বিএনপির পুরাতন কমিটি বিলুপ্ত করে সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে প্রথম সদস্য করে ৮৭ সদস্য বিশিষ্ট জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেন চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। জেলার সিনিয়র সকল নেতাকর্মীকে নিয়ে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হলেও আহবায়ক কমিটি গঠনের শুরু থেকেই বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চলছে জেলা বিএনপির রাজনীতি।
অতীতে তিনগ্রুপে বিভক্ত হলেও বর্তমানে দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চলছে জেলা বিএনপির রাজনীতি। বর্তমান আহবায়ক কমিটি গঠনের পর ইতোপূর্বে জেলা বিএনপির সম্মেলন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অবশেষে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি মাসের ১৯ তারিখ জেলা বিএনপির সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে।
জেলা বিএনপির আহবায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী, আহবায়ক কমিটির প্রথম সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও আহবায়ক কমিটির সদস্য সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরিনের নেতৃত্বে রয়েছে এক গ্রুপ।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সাবেক হুইপ অ্যাড. ফজলুল হক আছপিয়ার সমর্থক হিসাবে পরিচিতদের রয়েছে পৃথক আরেক গ্রুপ। এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ওয়াকিফুর রহমান গিলমান, নাদির আহমদ, আবুল মনসুর শওকত, জেলা বিএনপির সদস্য সদর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আকবর আলী, জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক ও জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম নূরুলসহ আরো অনেকেই।
গত ২০১৩ সালের যুবদল নেতা আনছার উদ্দিনকে আহবায়ক, এটিএম হেলাল, সোহেল আহমদ, মাহবুর হোসেন জাহিদ ও অ্যাড. মামুনুর রশিদ কয়েছকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩১ সদস্য জেলা যুবদলের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। আহবায়ক কমিটি গঠনের পর থেকেই নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব কোন্দল রয়েছে। আহবায়ক কমিটি গঠনের ৩ বছরেও জেলা যুবদলের সম্মেলন করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
একইভাবে ২০১০ সালের ১০ ডিসেম্বর নুরুল ইসলাম নুরুলকে আহ্বায়ক, আমিনুর রশিদ আমিনকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৯ সদস্যের জেলা আহ্বায়ক কমিটি করে দেওয়া হয় জেলা ছাত্রদলের। প্রথমে সংগঠন দুই গ্রুপে বিভক্ত ছিল। একাংশের নেতা ছিলেন নুরুল ইসলাম নুরুল, অন্য অংশের আমিনুর রশিদ আমিন। গত দুই বছর ধরে সংগঠন হয়েছে ত্রিধাবিভক্ত। তৃতীয় অংশের নেতৃত্বে আছেন অপর যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল হক শফিক। সাধারণ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের অভিযোগ আহবায়ক কমিটি গঠনের প্রায় ৬ বছর শেষ হওয়ার পথে কিন্তু সম্মেলন করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে ছাত্রদলের রাজনীতি গতিশীলতা আসছে না।
জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক ও জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম নূরুল বলেন,‘ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সুনামগঞ্জের সার্বিক বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। আমরা আশা করছি খুব শিগররই জেলা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ত্যাগী ও মাঠের সক্রিয় ছাত্রনেতাদের মূল্যায়ন করবেন কেন্দ্রীয় কমিটি।’
জেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক অ্যাড. মামুনুর রশিদ কয়েছ বলেন,‘আমরা চাই দ্রুত সম্মেলন করা হোক। কিন্তু আহবায়ক ও সিনিয়র যুগ্ম আহবায়কের মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের কারণে জেলা সম্মেলন হচ্ছে না।’
জেলা যুবদলের আহবায়ক আনছার উদ্দিন বলেন,‘আমাদের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ নেই। আমরা সম্মেলন করতে চাই। কিন্তু রাজনীতির অনুকূল পরিবেশ না থাকার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা দলীয় কর্মসূচির মিছিল-মিটিং করতেই পারি না। পুলিশ আমাদের নানাভাবে হয়রানী করছে। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে আমরা আগামী ৩ মাসের মধ্যে সম্মেলন করার চেষ্টা করব।’
জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য একাংশের নেতা নাদির আহমদ বলেন,‘জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি জেলার ১৪ টি ইউনিটে এক তরফাভাবে কমিটি গঠন করেছেন। এসব কমিটি পকেট কমিটি, কমিটিতে সুবিধাবাদীরা স্থান পেয়েছে, ত্যাগীরা বাদ পড়েছেন। এই ১৪ ইউনিটে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করে সবার সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিটি গঠন করার পর জেলা সম্মেলন করার দাবি জানিয়েছি আমরা। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আগে জেলা সম্মেলন হবে না।’
জেলা বিএনপির আহবায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন,‘ জেলা নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিরোধ নিরসণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাহেব সিলেটে আমাদের নিয়ে পৃথকভাবে বসেছিলেন। আমরা আমাদের কথা বলেছি, তারা তাদের কথা বলেছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের উভয় পক্ষের কথাই শুনেছেন। তবে কোন সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়নি। আমরা দ্রুত সম্মেলন করতে চাই। তবে ১৯ তারিখ সম্মেলন হবে কি না তা নিশ্চিত হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দই জেলা সম্মেলনের তারিখ ঠিক করবেন। কেন্দ্র থেকে আমাদের সম্মেলনের তারিখ দিলে আমরা সেই তারিখ মোতাবেই সম্মেলন করব।’


