সজীব দে
‘আমি গতকাল নিয়ে বাঁচি না। আগামীকাল কী হবে, আমার মৃত্যুর পর আমার লেখা কে পড়ল-কে পড়ল না, তা নিয়েও আমি ভাবি না। আমি আমার নিজের মতো করে লিখে যাচ্ছি। প্রবল আনন্দ নিয়েই লিখছি। জীবনটাও খুব আনন্দের সঙ্গেই কাটাতে চাইছি। এবং আমি সুখী। কারণ আমি জানি, কীভাবে সুখ খুঁজে নিতে হয়।’
জীবনের সুখ খুঁজে নিয়েছিলেন বলেই হয়তো ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে প্রথম দফা চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে এতটা হাসিমুখে অকপট বিদায় নিতে পেরেছিলেন তিনি। ছাত্রাবস্থায় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’র মধ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। উপন্যাসের ভূমিকায় অধ্যাপক ড. আহমেদ শরীফ লেখেন, ‘হুমায়ূন বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবন রসিক’। চার দশকের যাত্রার অবসান ঘটে জাতির জনকের হত্যাকান্ডের উপর লেখা ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস ‘দেয়াল’র মধ্যে দিয়ে। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের একুশে বইমেলায়। দুইটি আখ্যানে বিভক্ত ‘দেয়াল’ উপন্যাসে উঠে এসেছে অবন্তি নামের প্রথা বিরোধী মেয়ের কাহিনী এবং সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-, মোশতাকের ক্ষমতা লাভ, মোশারফের অভ্যুত্থান, চার নেতা হত্যা, সিপাহী জনতার বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা লাভ ও হত্যাকা-। সরকারি নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, মাত্র দুই মাসে ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ১১৪৩ জন সৈনিক ও অফিসারকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে। হুমায়ুন আহমেদ এর মতে, এদের দীর্ঘনিশ্বাস জমা হয়েছিল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে, যেখানে জিয়া প্রাণ হারান।’ আর এরই মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে উপন্যাসের।
সমাজের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার ছিল বলেই লিখেছেন, ‘হলুদ হিমু ও কালো র্যাব’। বিটিভির একটি নাটকে টিয়ে পাখির মুখের একটি সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মানুষের মনে তীব্র ঘৃণার সৃষ্টি করে। যা সেই সময়ে ছিল দুঃসাহসিক উচ্চারণ। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ বাতিলের দাবিতে মানুষ রাস্তায় রাস্তায় মিছিল-সমাবেশ করেছে। কোনো টিভি নাটকের একটি চরিত্র নিয়ে এ রকম আবেগ শুধু বাংলাদেশে কেন, সারাবিশ্বেই এক বিরল ঘটনা।
জনশ্রুতি আছে, বাংলা একাডেমীর অমর একুশের বইমেলায় প্রকাশকরা যে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ করেন, সব বই মিলিয়ে যা বিক্রি হতো, একা হুুমায়ূন আহমেদের লেখা বই তার প্রায় সমান বিক্রি হতো, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। হাস্যরস, নি¤œমধ্যবিত্তের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন, মর্মান্তিক ট্রাজেডি, সমাজ-জীবনের নানা ঘটনা উঠে এসেছে তার জাদুকরি লেখনীর মাধ্যমে। একাধারে লিখেছেন, গল্প, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণ কাহিনী, রূপকথা, শিশুতোষ, কল্পবিজ্ঞান, আত্মজীবনী, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। করেছেন চলচ্চিত্র পরিচালনা, সঙ্গীত রচনা, সুরারোপ, চিত্রাঙ্কন। মুক্তিযুদ্ধ তার লেখায় উঠে এসেছে বার বার। তাঁর উজ্জ্বল স্বাক্ষর জোছনা ও জননীর গল্প, ১৯৭১, আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, নির্বাসন প্রভৃতি। শিল্প-সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনকও বলা হয়ে তাকে। যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই রেখেছেন সাফল্যের চিহ্ন।
‘মানুষের সব শখ মেটা উচিত নয়,
একটা কোনো ডিসস্যাটিসফেকশন থাকা দরকার’
সিলেটের মীরাবাজারের বাসায় এক গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, দেখি মশারির ভেতর ঠিক আমার চোখের সামনে আলোর একটা ফুল ফুটে আছে। বিস্ময়, ভয় ও আনন্দে আমি চেঁচিয়ে উঠলামÑ এটা কী ? বাবা আমার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, জোছনার আলো ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে মশারির গায়ে পড়ছে। …..আমি হাত বাড়াতেই আমার হাতে উঠে এল, কিন্তু ধরা পড়ল না। …..কতবার ফুল ধরার চেষ্টা করলাম পারলাম না। সৌন্দর্যকে ধরতে না পারার বেদনায় কাটল আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবন। …. (আমার ছেলেবেলা) সেই জোছনার ফুল ধরতে পারেননি তিনি। তবে জোছনা ভরা রাতে পৃথিবী ত্যাগ করার আকাংখা প্রকাশ করেছিলেন। ….
‘চাদনী পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।’
কিন্তু নিয়তি তার কথা শোনেনি, দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক সকালে ঘুমের ভেতরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ৫ বছর আগে আজকের দিনে বাংলাদেশ সময় তখন ছিল রাত সাড়ে ১১টা।
হুমায়ূন আহমেদ এর কালজয়ী চরিত্র বোহেমিয়ান হিমু ও মনোবিজ্ঞানি মিসির আলী। বাংলা সাহিত্যে দুই বিপরীত ধারার চরিত্র। হয়তো নিজের ব্যক্তিত্বের দুই প্রতিরূপে সৃষ্টি করেছিলেন হুয়ায়ূন আহমেদ। মানুষ হিসেবে তাঁকে তারই সৃষ্ট চরিত্র হিমু এবং মিসির আলীর মতোই রহস্যময় বলে মনে হয়। তারই সৃষ্ট রহস্যময় চরিত্র হিমু বলেছে ‘জোছনার কোন রঙ থাকে না’। হয়তো তিনি গিয়েছেন সেই অধরা রঙহীন জোছনার দেশে। তবে নিজের সৃষ্টি রেখে গেছের আমাদের জন্য। সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ¯্রষ্টাকে অনুভব করতে পারি আমরা। তাই বলতে পারি তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন। আছেন প্রতিটি পাতার গন্ধে, প্রতিটি পাতার বর্ণে, আছেন স্পর্শে। মৃত্যুঞ্জয়ী হুমায়ূন আহমেদ চিরকালীন হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্য জগতে, বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে। হূমায়ূন আহমেদ এর ভাষায়……..
‘পাখি উড়ে গেলেও পলক ফেলে যায়
আর
মানুষ চলে গেলে ফেলে রেখে যায় স্মৃতি’।


