জয়তু নিভৃতচারী নিবরস

বিশ্বজিত রায়
মাথায় অবিন্যস্ত ঝাঁকড়া চুল। শ্মশ্রুশোভিত মায়াবী মুখাবয়ব। নিভৃতচারী উদাসী মনের এক চরিত্র। পাকা আধাপাকা আওলাকেশী দাঁড়িগোফযুক্ত লুঙ্গি পাঞ্জাবি বসনের চারুদেহী পরিচ্ছন্ন পুরুষ। দেখলে মনে হয় যেন কবি-সাহিত্যিক কিংবা কোনো সঙ্গীতজ্ঞ। মুখচ্ছবিতে লুকায়িত আছে সলজ্জ ভাব। পোশাক পরিচ্ছদে পুরোটাই বাঙালিয়ানা ছাপ। কথা বলার ধরনে রয়েছে সুসভ্য মিষ্টতা। অতি সাধারণ ধাঁচের মাটিমাখা আনমনা ব্যক্তিত্বের বাহক এক খাঁটি দেশবন্ধু। প্রান্তিক পথের সাদাসিধে নিশ্চিন্ত নিখাঁদ অকুটিল মানুষটির বড় পরিচয় তিনি মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতা তরে রয়েছে তার বীরত্বপূর্ণ অবদান। একাত্তরের যুদ্ধ ময়দানে তিনি ছিলেন অস্ত্রধারী হার না মানা সফল সৈনিক। স্বাধীনতা সংগ্রামে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা প্রশংসনীয় কর্মের অধিকারী এই লোকটির নাম নিবরস সরকার।
বেশ কিছুদিন ধরেই খোঁজ করছিলাম শেষ বয়সী এই মানুষটির। খোজাখুঁজির একপর্যায়ে তাঁর গন্তব্যস্থল জামালগঞ্জের বিউটি ফার্মেসিতে গিয়ে হাজির হলাম। ঔষধালয়ে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, মুক্তিযোদ্ধা নিবরস বাবু কি এখানে আছেন? উত্তর আসলÑ পেছনে ঘুমাচ্ছেন। প্রবেশ করি সেখানে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরকোণে আবছা কিছু ভাসছিল। গলা বাড়িয়ে কিছু জানতে চাইলে, তিনি শয্যাস্থান থেকে হ্যাঁ সূচক কণ্ঠে জানালেন আসছি। খানিকক্ষণের মধ্যেই তিনি তমসা ভেঙে বেরিয়ে আসলেন সামনে। করজোড়ে প্রণাম জানালে মৃদু হাসিতে আসল হাত উঁচানো জবাব। পরিচয় প্রদানের পর দিলেন বসার তাগিদ। তখন অন্য কোথাও বসার অনুরোধ জানালে তিনি সহমত পোষণ করে ছাতা হাতে নিঃসংশয়ে বেরিয়ে পড়লেন এই নিবন্ধকারের সাথে। হাঁটতে হাঁটতে এক রেস্তোরাঁয় গিয়ে হাজির হলাম। চা চুমুকে শুরু হলো দুজনার কথোপকথন।
নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছিল। আজ আমরা যে স্বাধীন ভূখ-ে বসবাস করছি সেই বঙ্গরাজ্যের জন্মলগ্ন অর্থাৎ মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করা কোনো এক সর্বোত্তম সূর্যসন্তানের সাথে পাশাপাশি বসে কথা বলতে পারছি সেটা যেন আমার দেহ ও মনে অন্যরকম অনুভূতি সাড়া জাগাচ্ছিল। নিজের মুক্তিযুদ্ধ সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমেই ছিল তাঁর সহজ সরল স্বীকারোক্তি, ‘অত্তকিছু আমার মনে নাই, তারপরেও যা মনে আছে তা কইথাম পারমু, কইন কিতা জানতে চাইন।’ স্বাধীনতার স্বাক্ষী মহান এই মানুষটি সম্পর্কে কি জানতে চাইব সেটা নিয়ে তাঁর অগোচরে কিছুক্ষণ ভাবতে হলো আমায়। ভাবনার একপর্যায়ে নানা প্রশ্নে জর্জরিত করলাম কৃতি এই মানুষটিকে। মৃদু হাস্যেজ্জ্বল ভঙ্গিমায় সব কথার উত্তর দিয়ে গেলেন।
তিনি যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা। বীরবেশী দেশদরদী মহৎ প্রাণের প্রতীক। এ দেশের জন্ম ইতিহাসের সাথে নিবরস সরকারের রয়েছে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। তিনি জামালগঞ্জ উপজেলার দশ-বারো কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বিনাজোড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্বর্গীয় বিপিন সরকার ও রাজকুমারী সরকারের কন্যাহীন তিন পুত্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়ে ছেষট্টি ছুঁইছুই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কোনো এক মুহূর্তে তাঁর জন্ম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে দিরাই ও জামালগঞ্জের মধ্যবর্তী ভাটিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর আগে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন গ্রাম্য পাঠশালা বিনাজোড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। ভাষা আন্দোলনের আন্দোলিত সময়ে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির জীবনও কাটছে অনেকটা অগোছালো সংগ্রামে। সংসার পরিত্যাজ্য নিবরস সরকারের অস্থায়ী ঠিকানা জামালগঞ্জের বিউটি ফার্মেসী। সেখানে বসেই সময় কাটান। মাঝে মাঝে ক্লান্তি দূর করতে ঘুমিয়ে পড়েন ফার্মেসী পেছনের খাটে। মন চাইলে গ্রামের বাড়ি বিনাজোড়ায় আপন জনের সংস্পর্শে ছুটে যান। এছাড়া জামালগঞ্জের তেলিয়াপাড়াস্থ একটি বাসায় রাতযাপন করেন। আর খাওয়া-দাওয়ার ভোজন সংক্রান্ত ক্রিয়াদি তিনি রেস্টুরেন্টে সেরে ফেলেন। ভবঘুরে এই মানুষটিই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান একাত্তরের যুদ্ধসারথী বীরপুরুষ। অনাদরে অবহেলা আর একাকীত্বে কাটছে তার জীবন। পল্লীপথে হাঁটলে কেউ চিনতেও পারবে না যে এই মানুষটাই স্বাধীনতা চিনিয়ে আনা যোদ্ধাদলের একজন বিজয়ী সুমহান দূত।
একাত্তরে যুদ্ধকালীন সময়ে নিবরস সরকার ছিলেন সতেরো-আঠারো বছরের টগবগে যুবক। আর এ সময়টাই যেকোনো যুবকের জন্য যুদ্ধে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। করলেনও তাই। ’৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতের তিমিরে শুরু হলো বাঙালি নিধনের পাক প্রক্রিয়া। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকবাহিনী বন্দী করে কোথায় নিয়ে গেল তা জানে না ভাগ্যবিড়ম্বিত কোটি বাঙালি। অভিভাবকহীন পূর্ব বাংলা যখন পাকশত্রুদের আক্রমণের সহজ শিকারে পরিণত হলো তখন নিজেকে মায়ের আঁচলে লুকিযে রাখতে পারেননি যুবাবয়সী নিবরস। সকল বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে মুক্তিকামী বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে নেমে পড়লেন যুদ্ধে। বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্টের (মুজিব বাহিনী) অধীনে তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ। সীমান্তের ওপারে হাফলং ক্যান্টনমেন্টে প্রায় দেড় মাস ট্রেনিং শেষে অস্ত্র (এলএমজি) হাতে নেমে পড়েন শত্রুর মোকাবিলা করতে। তখনকার সময়ে ভারতের কেড়াপাড়া হোল্ডিং ক্যাম্পে বর্তমান রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আবদুল হামিদ এর সাথেও তার সাক্ষাত হয়েছিল। জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কমান্ডার ইউসুফ আল আজাদের নেতৃত্বে নিজ এলাকা জামালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। অস্ত্র লুকিয়ে রাখার বিভিন্ন বাধ্য-বাধকতা মাথায় রেখে অনেকটা নির্জনে পরিচালনা করেছেন যুদ্ধ সমর্পিত সব দায়িত্ব। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন যুদ্ধমাঠে।
নিবরস সরকার একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তার সহযোদ্ধা নিরেশ চক্রবর্তী, বিশ্বম্ভরপুরের শ্যামল কুমার আচারিয়া, নিজ গ্রাম বিনাজোড়ার অনীল পুরকায়স্থসহ আরো অনেকে। শ্যামল আচারিয়া ছিলেন তার হেলপার। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে জাতির জনকের কাছে যুদ্ধাস্ত্র জমা দেন। স্বাধীনতা পরবর্তী জীবন পরিচালনায় কি কোনো পেশা বেছে নিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নিবরস সরকার বলেন, না। তবে আমি কৃষক সংগ্রাম সমিতির সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। এছাড়া আইডিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার অর্গানাইজার হিসেবে কাজ করেছি। বেদে শিশুদের নিয়ে ‘ঝরাকলি পাঠশালা’ নামের একটি স্কুল পরিচালনা করতেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার সহযোগী ছিলেন জামালগঞ্জ মডেল স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাসেম।
মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর অন্যতম এই সদস্য এখন সরকারের দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় খেয়ে পড়ে বেঁচে আছেন। মনে হলো সংসার ত্যাগী জীবনে নিবরস সরকার বেশ সুখী। চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই তার জীবনে। নিত্য সংগ্রামী এই মানুষটির কথোপকথনে মনে হয়েছে তিনি ভাবনাহীন নির্ভেজাল সময় পার করছেন। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে জড়িত বিজয়ী মুকুট পড়া জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানের তকমাধারী নিরহংকার নিবরস সরকার বেঁচে থাকুন বর্তমান প্রজন্মের আদর্শিক চেতনারূপে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে ও বুঝতে তার মতো মানুষের বেঁচে থাকা খুবই জরুরী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের জ্বলন্ত বাস্তবতার প্রতীকি প্রহরী। সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক জীবনসহ তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। জয়তু নিবরস সরকার।
লেখক: কলামিস্ট ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার