ঝরে পড়ছে হাওর পাড়ের ছাত্ররা

আকবর হোসেন, জামালগঞ্জ
আমার ভাইডা নষ্ট হইয়া যাইতাছে,খালি আমরারে ফাঁকি দেয়,আমরারে স্কুলের কত কইয়া বাড়ির থাইক্কা বাইর অয়,আর স্কুল যায়না,খালি পোলাফাইলের সাথে আমরার বাড়ীর সামনে গোলামীপুর আর শাহপুরের দোকান গুলার মাঝে সারাদিন কেরাম আর গাফলা খেলে টেখা দিয়া,অখন আমার ভাইডা বাড়ী থাকি না কইয়াও টেখা নেয়। আমার ভাইডারে আপনেরা বাচান,তার ভবিষ্যতটা নষ্ট অইয়া যাইতাছেগা। আমরা বাধা দিছি আমরার কথা কেউ শুনে নাই। এভাবেই মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা ছোট ভাইয়ের কথা গুলো বলছিলেন উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের গোলামীপুর গ্রামের নাজ সোলাইমান। নাজ সোলাইমানের ছোট ভাই তানহা জামালগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
শুধু তানহা নয় জামালগঞ্জের অধিকাংশ বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে কেরাম, গাফলা সহ লুডু খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। যতই দিন যাচ্ছে পরিবারের অভিভাবকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের ও ছোট বড় হাট বাজারগুলোতে চলে টাকা দিয়ে কেরাম. গাফলা আর সাপ লুডু খেলা। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুল সময়ের আগেই বাড়ী থেকে বের হয়ে খেলতে লেগে যান। শিক্ষার্থীরা প্রথম দিকে দুজনের মধ্যে যে হারে সে কেরাম গেইমের টাকা পরিশোধ করে। আর প্রতি গেইমের আধা ঘন্টা হিসেবে তাদেরকে গুনতে হচ্ছে ২০-২৫ টাকা। একই ভাবে লুডু প্রতি গেইমে ৩০ থেকে ৪০ টাকা আর গাফলা খেলায় ৫০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। আর এই গেইমের আয়োজন করছে রাস্তার আশপাশ, ছোট ছোট বাজার, গ্রামের ভিতর ও পাড়ার চায়ের আর মুদি মালের দোকানগুলোর এক পাশে। এমনকি অধিকাংশ দোকানগুলোতে ভিডিওর পাশাপাশি একাধিক কেরাম বোর্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।
গত রবি ও সোমবার সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সদরের শাহপুর নতুন রাস্তার মোড়, শাহপুর মোছাব্বিরের বাড়ীর পাশে, শাহপুর বাধ বাজার, জামালগঞ্জ সেলিমগঞ্জ সড়কের নয়াহালট গ্রামের ৫টি দোকান, চানপুর হারুন মার্কেট ও সোনাপুর গ্রামের অন্তত  ১৫ টি দোকান, লক্ষীপুর সহ উজান লালপুর ও ভাটী লালপুরের অন্তত ১২টি দোকানে, সেলিমগঞ্জ, রামপুর, জামলাবাজ, গজারিয়ার অধিকাংশ দোকান গুলোতে চলছে কেরাম সহ গাফলা খেলা। আর প্রতিটি দোকানেই রয়েছে স্কুলপড়–য়া ছাত্ররা। তারা কেরাম ৪ জনে খেলছেন আর আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী খেলার জন্য অপেক্ষায় আছে। আবার কোন কোন দোকানে দেখা গেছে ছাত্ররা গাফলা খেলছে, আবার একাধিক দোকানে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। একদিকে শিক্ষার্থীরা লুডু খেলছে অপর দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ভিডিও দেখছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম আর ছোট ছোট হাট বাজারগুলোতে উঠতি বয়সী ছেলেদের আকৃষ্ট করতে অশ্লীল ছবির প্রদর্শন করা হচ্ছে। আর সে কারণেই শিক্ষার্থীরা স্কুল ফাঁকি দিয়ে টাকা দিয়ে কেরাম লুডু আর গাফলা খেলার প্রতি মনোযোগ দিয়েছে। এলাকাবাসী, সুশীল সমাজ, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সকলের জোরালো দাবি দোকানগুলো থেকে অচিরেই কেরাম, গাফলা সহ লুডু খেলা বন্ধ করার।  
এবিষয়ে নাজ সোলাইমান বলেন, আমার ছোট ভাই তানহা পড়া লেখায় ভালো ছিলো, স্কুল ফাঁকি দিয়ে পাড়ার দোকানগুলোতে টাকা দিয়ে কেরাম আর গাফলা খেলার কারণে আজ তার পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়েছে। পাড়ায় দোকানগুলো থেকে যদি কেরাম আর গাফলা খেলা বন্ধ না করা হয় তাহলে আমার ভাই না আরো অনেক বোনের ভাই নষ্ট হয়ে যাবে।
স্থানীয় লক্ষীপুর গ্রামের আজির উদ্দিন বলেন, আমরার পুলাপাইন স্কুল না গিয়া হারা দিন দোকানে গিয়া টেখা দিয়া খালি কেরাম খেলায়। একই ভাবে চানপুরের  ইমান মিয়া বলেন, আমরা পোলাপাইনরে কত ফর দিয়া রাখমু, সব দোকানেই কেরাম আর টিভি। সন্ধ্যার পরেও পোলাপাইন দোকানে গিয়া খেলাত লাইগ্যা যায়।  
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ সদর ইউপির সদস্য কামরুল ইসলাম,জিয়াউর রহমান,গোলাম হোসেন,আবুল কালাম বলেন, এবিষয়টি নিয়ে আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইতিমধ্যে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিছু দিন কয়েকটি দোকানে বন্ধও ছিলো। যদি দোকানগুলো থেকে কেরাম, লুডু আর গাফলা খেলা বন্ধ না করা যায় তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরা আলোর মুখ দেখবে না।
জামালগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফুর রহমান বলেন, বিষয়গুলো আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। শুধু আমার ছাত্র না প্রাইমারির ছাত্ররাও কেরাম লুডু, গাফলার প্রতি আসক্ত হচ্ছে। তার চেয়ে আরো বেশী ভয়ংকর গ্রামের দোকান গুলোতে ডিডিওতে প্রতিনিয়তই ছবি দেখাচ্ছে। ছাত্ররা স্কুল ফাঁকি দিয়ে এগুলো করছে, আমরা খবর নিচ্ছি। অনেক অভিভাবক ইতিমধ্যে আমাকে বিষয়টি অবহিত করেছেন।
জামালগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আতিকুর রহমান বলেন,আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে এই বিষয়গুলোতে থেকে ফেরাতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। কেরাম, গাফলা খেলা হয় এমন দোকানগুলোতে অচিরেই অভিযান চালানো হবে।  
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার টিটন খীসা বলেন, শিশুরা পবিত্র, তারা যা দেখে তা শিখে, সমাজের উপরই শিশুদের ভবিষ্যত নির্ভর করছে।
পাড়ার গ্রাম ও ছোট ছোট হাট বাজার গুলোর দোকান থেকে কেরাম, গাফলা সহ লুডু খেলার বিষয়গুলো জোরালো ভাবে দেখা হবে ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।