Deprecated: Required parameter $month follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $day follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $year follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $display_count follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292

Deprecated: Required parameter $total_shares follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292
‘ঝিয়েরে পড়াইয়া লাভ নাই, ঝিয়াইত পরের ঘরও যাইবো গি’ – সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক

‘ঝিয়েরে পড়াইয়া লাভ নাই, ঝিয়াইত পরের ঘরও যাইবো গি’

বিশেষ প্রতিনিধি
ছেলেডারে (ছেলেকে) চাঁদপুরের একডা (একটা) মাদ্রাসায় পড়াইতেছি। দুইজনেরে পড়াইলে খরচ বেশি অয়, চিন্তা করলাম ছেলেডা সংসারের কাজে লাগবো নে, মেয়েডারে কয়দিন পরে বিয়া দিলাইমু (দেব), হেরে পড়াইয়া কি লাভ অইতো, হের লাগি মেয়েরে পড়া ছাড়াইদিসি’।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের মো. এরশাদ মিয়া কন্যা শিশুর প্রতি অবজ্ঞার সুরে কথাগুলো বলছিলেন। পাশেই দুঃখে কষ্টে অশ্রু ঝরাচ্ছিল ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠেই ঝড়ে পড়া কন্যা শিশু আয়েশা।
বাবা এরশাদ মিয়ার কথা শেষ হলে মা মালেকা বেগমের কাছে প্রশ্ন, মেয়ের জন্য সরকার উপবৃত্তির টাকা দেয়, আপনার মেয়ে পেয়েছিল কি? মা মালেকা বেগম এর উত্তর ছয় মাসে ১২শ’ টাকা পেয়েছিল।
তাহলে পড়াশুনা ছাড়ালেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মা মালেকা বেগম স্বামীকে ইঙ্গিত করে বললেন, হেরা চাইছে না, আমি কি করবো।
মা-বাবার কথার পর আয়েশার কাছে জানতে চাওয়া স্কুলে যাচ্ছো না কেন? চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো, ‘মা-বাবা হরচের (খরচের) টেহা দিতা পারইন নাা, হের লাগি লেহাপড়া ছাইড়া দিসি।’ আয়েশা জানালো, আরেক বাড়িতে মাসে দুই হাজার টাকা বেতনে গৃহপরিচারিকার কাজ করছে সে। ওখানে কাজ করে বাবা-মাকে মাসে দুই হাজার টাকা এনে দিচ্ছে।
এরশাদ ও মালেকাই কেবল নয়। কন্যা শিশুর প্রতি বৃহৎ গ্রাম সৈয়দপুরের আরও অনেকেরই অবজ্ঞা শুনা গেল।
গ্রামের লালশাহ মিয়া ও শাহিনা বেগমের তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।
সন্তানদের পড়াশুনার বিষয়ে জানতে চাইলেই তিনি বললেন, পুলাডারে পড়ানির লায় ভিটা বাড়ি বেছতেও রাজি আছলাম। পুলাডায় পড়লো না।
আবার এও জানালেন, খরচের জন্য করোনার সময় অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে ফুলবানু’র পড়াশুনা ছাড়িয়ে দিয়েছেন। মোবাইলে সিমে ঝামেলা হওয়ায় ফুলবানু উপ-বৃত্তির টাকাও পায় নি বলেও জানালেন শাহিনা বেগম।
শাহিনা বেগমের প্রতিবেশি হাসান আলী’রও দুই ছেলে গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করছে। তবে দুই মেয়ে খাদিজা বেগম ও ফাতেমা বেগমকে চট্টগ্রামে গার্মেন্টেসে কাজ করার চাকুরিতে দিয়েছেন তিনি।
হাসান আলী বললেন, ‘সংসারের খরচ চালানিই কষ্ট, পড়াইতাম কেমনে।’ ছেলে দুটোকে পড়াশুনা করার কথা জানিয়ে বললেন, ‘ওরা ছোট, খরচও কম, এজন্য ওদেরকে পড়াশুনা করাচ্ছি।’
গ্রামের গৃহিণী হেলেনা বেগম বললেন, ‘গ্রামের বেশিরভাগেই মনে করেন ঝিয়েরে পড়াইয়া লাভ নাই। ঝিয়াইত পরের ঘরও যাইবো গি। আমি হেইডা মনে করি না, আমার মেয়েরে বিয়া দেওয়ার পরেও বাড়ী আইন্না পড়াইছি। হকলরে এইডা বুঝাই, কেউ বুঝবার চায় না। পড়াশুনা করাইয়া মেয়েডারে বিয়া দিলে মেয়েডা সুখে থাকবো, নিজেরও বিপদ-আপদে ভরসা অইবো, ইডা বুঝবার চায় না কেউ।’
গ্রামের অনার্স পড়–য়া তরুণ আফসারুল জানালো, তারা আটজন ছেলে ও পাঁচজন মেয়ে পাশের গ্রামের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ছোট বেলায় পড়াশুনা করেছিল। ছেলেদের মধ্যে সাতজন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। একজন ব্যবসা করছে। মেয়েদের কারোরই পড়াশুনা হয় নি। ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। তার আফসোস, পড়াশুনা করলে, ওই মেয়েরাও হয়তো তার মতো বড় চাকুরির স্বপ্ন দেখতো।
সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামছুল আলম রাসেল জানালেন, সুনামগঞ্জের বড় গ্রাম সৈয়দপুর। গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়ে সাড়ে পাঁচশ শিক্ষার্থী। এরমধ্যে তিনশ মেয়ে এবং দুইশ পঞ্চাশ জন ছেলে। করোনা ও পরের বন্যার দখল সামলানোর সময় ৮০ জনের মতো ছাত্রী স্কুল ছেড়েছে। এদেরমধ্যে কমপক্ষে ৪০ জনের বয়স বাড়িয়ে বিয়ে হয়েছে। কেউ গার্মেন্টস, কেউ গৃহ-পরিচারিকা হয়েছে। গ্রামে দারিদ্রতা বা অভাব আছে। কিন্তু মেয়েদের জন্য উপ-বৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষাও তো আছে। এরপরও মেয়েদের বেশি ঝড়ার কারণ হচ্ছে, অভিভাবকরা মনের দিক থেকে এখনো ছেলে ও মেয়ে শিশুকে সমানভাবে দেখতে পারছেন না। অনেকেই মেয়েকে পড়ানোর চাইতে ছেলেকে পড়ালে ভালো হয় ভাবেন। এই মানসিকতা দূর করতে কেবল স্কুলের শিক্ষক নয়, সকলকে কাজ করতে হবে। ছেলে- মেয়ে সমানভাবে না এগুলে সমাজ দেশ পিছিয়েই থাকবে বলে মন্তব্য তাঁর।
জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরি ভট্টাচার্য বললেন, গ্রামীণ জনপদে কন্যা শিশুর নিরাপত্তার জায়গাটি দুর্বল। কাউকে বিশ^াস করা যায় না। সমাজ ও পরিবারেও বৈষম্য আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবার পথে কোন কন্যা শিশুকে ইভটিজিং বা যৌন নীপিড়নের ঘটনা ঘটেছে শুনলে অভিভাবকরা বলবেন,‘না না মেয়ের স্কুলে যাবার প্রয়োজন, কোন কলংক হবে।’ আর্থিক দৈন্যতার ক্ষেত্রে সকল নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কন্যা শিশুর উপর। যেটি করোনা ও বন্যাকালে সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে দেখেছি আমরা।
জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বাদল চন্দ্র বর্মণ বললেন, ২০১১ সালের পরিসংখ্যান সুনামগঞ্জে কন্যা শিশু ছিল ছয় লাখ, এবারের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা বাড়তে পারে। ছেলে ও কন্যা শিশুর এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে এখনো সমতার অভাবে কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কুসংস্কার, দারিদ্রতা ও বাল্যবিয়ের নেতিবাচক প্রভাব কন্যা শিশুদের উপরই বেশি পড়ছে।
কন্যাশিশুদের শিক্ষার অধিকার, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা ও ন্যায্য অধিকার, চিকিৎসা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা পালনের উদ্দেশেই এ বছরও বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস বলে জানালেন তিনি।