বিশ্বজিৎ রায়, (শনি ও হালি হাওর ঘুরে এসে)
জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ এখনও শুরু হয়নি। শনির হাওরের অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ লালুর গোয়ালা ও ঝালো কালিবাড়ী ভাঙাসহ হালি হাওরের পাথাড়িয়া বাঁধে কেবল বাঁশ পুতে দায়সাড়া দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করা হচ্ছে। হালি হাওরের আরেক ঝুঁকিপূর্ণ কালীবাড়ি বাঁধেও শুরু হয়নি কাজ। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এই ৪ ক্লোজারে এখনও পড়েনি একমুঠো মাটিও। এছাড়া জামালগঞ্জের আরেক বৃহৎ হাওর পাগনার অবস্থাও প্রায় একই রকম। প্রতিটি বাঁধে শুধুমাত্র প্রকল্পের সাইনবোর্ড টানানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। বোর্ড দেখেই বুঝতে হচ্ছে, এখানে বাঁধ হবে। খোঁজ নেই পিআইসি’র কিংবা মাটি কাটার এস্কেভেটার বা শ্রমিকেরও। সরজমিন ঘুরে এমন বাস্তবতাই চোখে পড়েছে। তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও জামালগঞ্জসহ তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত বৌলাই নদীর তীরবর্তী শনির হাওরের অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ লালুর গোয়ালা ও ঝালোকালি এবং হালি হাওরের মদনাকান্দি পাথাড়িয়া ভাঙায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শুধু সারি সারি বাঁশ পুতে রাখা হয়েছে। এই বাঁশগুলোই কেবল কয়েকদিন ধরে দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা। অন্যদিকে জামালগঞ্জের হালির হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ কালীবাড়ি বাঁধে এক কোদাল মাটিও ফেলা হয়নি। এখানে মাটি ফেলার আগেই বাঁধের কিনারে লাগানো হয়েছে আগাছা (উজাড়ি বন)। কোন বাঁধেই সংশ্লিষ্ট কারও দেখা পাওয়া যায়নি। জনশূন্য বাঁধগুলো দেখে দ্রæত কাজ সম্পন্নের তাগিদ আছে বলেও মনে হয়নি।
জানা যায়, প্রতি বছর শনি ও হালি হাওরের ঝুঁকিপূর্ণ এই ৪টি ক্লোজার দিয়েই সবার আগে হাওরে পানি প্রবেশের শঙ্কা তৈরি হয়। ২০১৭ সালের ভয়াবহ দুর্যোগে লালুর গোয়ালা বাঁধ ভেঙ্গে নিমিষেই ডুবে গিয়েছিল শনির হাওর। ওই বছর কালীবাড়ি বাঁধের অবস্থাও ছিল প্রায় সঙ্কটাপন্ন। এই ক্লোজারগুলো নিয়ে প্রতিবছরই উৎকণ্ঠায় থাকেন কৃষকরা। অথচ. নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন (২২ জানুয়ারি বুধবার পর্যন্ত) কোন কাজই সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাঁশ পুতা হয়েছে, মেশিন আসলে দ্রæতই কাজ শুরু হয়ে যাবে।
হালি ও শনির হাওরের অধিকাংশ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় কোনটির কাজেই হাত
দেয়নি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সংশ্লিষ্ট লোকজন। প্রতিটিতেই নির্দেশিকা বোর্ড সাঁটানো থাকলেও কাজের কোন আলামত দেখা যায় নি। দু’একটিতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন পিআইসি’র লোকজন। কয়েকটি বাঁধে দুর্বা ঘাস সরানোর কাজ শুরু হয়েছে।
হাওরপাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার যাদেরকে পিআইসি করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগেই নামমাত্র কৃষক। কার্যত তারা বাঁধের কাজে অন্যের জন্য বদলি দিচ্ছে। এজন্য তাদের দায়বদ্ধতা কম বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
হালি হাওর পাড়ের হাওড়িয়া আলীপুর গ্রামের কৃষক আক্তার আলী বলেন, ‘বাঁধে কোন গাড়ি নাই, কোনো লোক নাই, তা হইলে কাজ কেমনে হইব। সময়মতো কাজ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমরার এই বান্ধে যারে কাজ দেওয়া হইছে, এর এইখানে কোন জমি নাই। তা হইলে হে কাজ করব কি কইরা।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা ৬৪ নম্বর পিআইসির সভাপতি মো. রাহিম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘হের কাজ করার মনমানসিকতা আছে বইল্যা মনে হয় না। ওই দোকানের সাইডে সাইনবোর্ডটারে কোন রকম হেলান দিয়া রাখছে। হে যে মাথ মাথে, বোঝা যায় কাজ না কইরাই টেকা তুইল্যা নিব।’
বদরপুর গ্রামের মো. খোকন মিয়া বলেন, ‘আমরার বাড়ির পাশের বাঁধ দেওয়া হইছে, প্রায় ১০ কি.মি. দূরের আছানপুর গ্রামের শাহিনুর মিয়ারে। এই বান্ধের কোন কিছুতেই এখনও হাত দেওয়া হইছে না। বাঁধের কাছের কেউরে কাজডা দিলে হয়তো তাড়াতাড়ি কাজ হইতো।’
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের ফেনারবাঁক ইউনিয়ন সভাপতি ও পাগনা হাওরপাড়ের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, এই হাওরে শুধু দু’একটা বাঁধের কাজ সুন্দর মতো এগুচ্ছে। আর বাকিগুলোতে কাজই ধরা হয় নাই।’
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, ‘এই পর্যন্ত ৬৯ টি পিআইসির মধ্যে মাত্র ৫টি বাঁধে কাজ হয়েছে, আরও ১২টি বাঁধে নামে মাত্র মাটি ফেলা হয়েছে। অন্য সব বাঁধে কোনো রকমের কাজ শুরুই হয় নি। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞেস করলে তারা শুধু মেশিন আসতেছে, আসবে, হবে, হচ্ছে বলে দায় সারার চেষ্টা করছে।’
পাউবো’র জামালগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারী প্রকৌশলী ও শাখা কর্মকর্তা মো. রেজাউল কবির বলেন, ‘কাজ চলমান, মেশিন আসতেছে।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা বাঁধে থাকার জন্যই পিআইসি হইছেন, কিন্তু কেউ বাঁধে নেই। আমরাও বাঁধে বাঁধে ঘুরতেছি, কাউকে পাচ্ছি না।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘বিপদজনক ক্লোজারগুলোতে কেবল বাঁশ পুতা হয়েছে সত্য। দু’একটিতে মেশিনও এসেছে, কাজ শুরু হয়ে যাবে। অন্যগুলোতেও দ্রæত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হবে।’ কোন পিআইসিতেই সংশ্লিষ্ট কাউকে খোঁজে পাওয়া যায়নি, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা সেগুলো নিয়ে লেখেন। এ অবস্থা আমিও দেখে এসেছি, শুধু বোর্ড টানানোই আছে, মানুষ নেই। তাদেরকে বাঁধে ডেকেও আনা যাচ্ছে না।’
এ ব্যাপারে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ‘প্রতি বছর প্রকল্প কমার কথা, কিন্তু প্রকল্প বাড়ছে। সেটা উদ্বেগজনক। গত বছরের চেয়ে ১৫০ টিরও বেশি প্রকল্প গ্রহণ করে অধিক বরাদ্দ দিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।’
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন নীতিমালা ৬’এর ৩ অনুযায়ী বাঁধের নিকটবর্তী জমির প্রকৃত মালিকের সমন্বয়ে কমিটি করার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। নীতিমালায় ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু ও ২৮ ফেব্রæয়ারির মধ্যে সমাপ্তির কথা উল্লেখ আছে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও সবকিছু মিলে পুরো জেলায় শতকরা ১৫ ভাগ কাজও শেষ হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন হাওরপাড়ের মানুষ।
হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির অভিযোগ নিস্পত্তিকারী কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. এমরান হোসেন বলেন,‘পিআইসি গঠন করেই পিআইসি সভাপতি ও সম্পাদকদের দ্রæত বাঁধের কাজ শুরু’র জন্য পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত দুই বছরের তুলনায় এবার এই সময়ে বাঁধের অগ্রগতি কম। অবশ্য কোনো কোনো বাঁধে কাজ করতে প্রতিবন্ধকতা আছে। এটাকে বড় কোনো সমস্যা হিসাবে দেখা যাবে না। অনেক পিআইসি’র বাঁধে মাটি প্রাপ্তির সুবিধা থাকার পরও তারা কাজ শুরু করেনি। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুরোধ করবো যে সব পিআইসি গাফিলতি করছে, তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য অথবা পিআইসি পরিবর্তন করে বাঁধের কাজ নিশ্চিত করে কৃষকেদের উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান বলেন, জেলা কমিটি ৭২৫ টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এরমধ্যে ৬০৯ টির কাজ শুরু হয়েছে। কাজের অগ্রগতি তুলানামূলক কম। মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এবার এই সময়ে হাওরে পানির উচ্চতা এক ফুট বেশি। এ কারণে কোন বাঁধে কাজ শুরু করা বিলম্বিত হচ্ছে। যে সব স্থানে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ আছে সেখানে যাতে গাফিলতি না হয়, এই বিষয়টি উপজেলা কমিটিগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে। যে সব পিআইসি’র কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সব মিলিয়ে এখনো আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। আমরা সকলে তৎপর থাকলে ২৮ ফেব্রæয়ারি’র মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবো।
- মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাদ্রাসায় শুরু হয়েছে কেবিনেট নির্বাচন
- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত প্রশংসাজনক


