টাঙ্গুয়া নিয়ে মতবিনিময় সভায় প্রাজ্ঞজনদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

কামরুল জাহাঙ্গীর
‘ছয় কুড়ি বিল নয় কুড়ি কান্দা’ নিয়ে গঠিত বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মডেল নিয়ে আজ জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা এর আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। এই হাওরে জলমহাল সংখ্যা ৫১টি। জলমহালগুলোর আয়তন ৬৯১২.২০ একর। তবে নল-খাগরা হিজল-করসবাগসহ বর্ষা কালে এই হাওরের আয়তন হয় ২০ হাজার একর। হাওরে ১৪০ প্রজাতির মাছ, ২৫০ প্রজাতির পাখি, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০ প্রজাতির সরিসৃপ ১ হাজারের বেশি প্রজাতির অমেরুদ-ি প্রাণী রয়েছে । মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি সহ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন বিধানের জন্য ২০০৩ সন থেকে হাওরটির ব্যবস্থাপনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বিদেশি অনুদান নির্ভর বেসরকারি সংগঠনের সহায়তায় এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। এবছর দাতাসংস্থা প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়ানোয় হাওর ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি তহবিল প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে। প্রায় অর্ধ লক্ষ পরিবার অর্থাৎ তিন থেকে সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ এই হাওরের উপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জীবিকার জন্য নির্ভরশীল।
২০০০ সনে রামসা টাঙ্গুয়ার হাওরকে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক এলাকা হিসাবে ঘোষণা করেছে। এটি মাদার ফিসারি অর্থাৎ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানে প্রজনন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। সুতরাং মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধিতে টাঙ্গুয়ার অবদান বিশাল। এখানে রয়েছে বহু প্রজাতির জলজ লতা,গুল্ম,ফুল ও বৃক্ষ। আসে অতিথি পাখি। তাই এর পরিবেশ ও প্রতিবেশগত গুরুত্ব অনেক বেশি। টাঙ্গুয়ার হাওরটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেষা। বর্ষায় এই হাওর বিশালাকার আকৃতি ধারণ করে।    
ভ্রমণ পিপাসুদের মধ্যে এই হাওরের কদর খুব বেশি। তাই বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটনমূল্যও কম নয়। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাওরের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ধারাবাহিক আলাপ আলোচনা, বিশ্লেষণ-পর্যালোচনা, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ-উপস্থাপন ইত্যাদি অতি প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থেই। এই প্রেক্ষাপটে আজকের মতবিনিময় সভাটির গুরুত্ব অনুভব করে আমরা অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে  একজন হাওরবাসী নাগরিকের নিতান্তই সাদামাটা দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু বিষয় উপস্থাপন করছি। আশা করি প্রাজ্ঞ অংশগ্রহণকারীগণ নিজেদের বিশেষায়িত জ্ঞানের সাথে আমাদের সাদামাটা বক্তব্যগুলোকেও বিবেচনায় নিবেন।
১। সরকারি ব্যবস্থাপনার এক যুগ আগে টাঙ্গুয়ার হাওরটি ইজারাপ্রথার আওতায় ছিল। বিল-জলাশয়ের দখল নিয়ে হাওরে খুন-খারাবি তখন ছিল নিত্যকার ঘটনা। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি সম্পদকে ঘিরে জেলায় গড়ে উঠেছিল হাতে গুণা কয়েকটি সুবিধাভোগী পরিবার যাদেরকে পরবর্তীতে ওয়াটারলর্ড অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়েছিল। ইজারাদাররা বর্ষাকালে বিলের সীমানার বাইরে  ভাসান পানিতে এমনকি বাড়ির আশপাশ এবং পুকুরেও মাছ ধরতে দিতেন না স্থানীয় গ্রামবাসীদের। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মানুষের যে সহজাত অধিকার সেটি শতভাগ লুণ্ঠিত ছিল সেসময়। ইজারাদারদের পাহাড়াদারদের অত্যাচারে অতীষ্ট ছিলেন স্থানীয় জেলে ও কৃষকরা। এর বিরুদ্ধে হাওর এলাকায় গড়ে উঠে ভাসান পানি আন্দোলন।
২। ইজারাদারি প্রথার এক পর্যায়ে সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে আধা পূঁজিবাদী ব্যবস্থা হিসেবে হাওর ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগকারী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। বিনিয়োগকারীর আওতায়ও হাওরটি নিয়ন্ত্রিত হয় বেশ কয়েক বছর। আগে যেখানে বহু ইজারাদার ভাগ বাটোয়ারা করে  বিলগুলোর মুনাফা লুটে নিতো বিনিয়োগপ্রথার মাধ্যমে তখন সেটি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ল কোম্পানির নামে ব্যক্তিবিশেষের মুঠোয়। সুতরাং সনাতনি ইজারাদার বা কিছুটা আধুনিক বিনিয়োগকারী সকলেরই হাওরের সম্পদ ভোগের চরিত্র ছিল একই এবং এই দুই প্রথায় হাওরবাসীর অধিকার হারানোর বিষয়টি ছিল একই রকমের। সুতরাং ইজারাদারি ও বিনিয়োগকারী মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ রূপেই বিবেচিত হয় হ্ওারবাসীর নিকট।
৩। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ তথা প্রকৃতি ও প্রতিবেশ রক্ষার তাগিদে সরকার ২০০৩ সনে টাঙ্গুয়ার হাওরে ইজারাদারি প্রথার বিলোপ ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন। সরকারের বিঘোষিত নীতি যেমন ছিল মৎস্য ও পরিবেশ-প্রতিবেশবান্ধব তেমনই ছিল হাওরবাসীর স্বার্থের জন্য অনুকূল। এই প্রথম প্রাকৃতিক সম্পদ টাঙ্গুয়ার সম্পদের উপর মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি মিলল। যেসব নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে টাঙ্গুয়ার হাওরের সর্বতো উন্নয়ন সাধিত হতো। কিন্তু আমাদের আমলাতান্ত্রিক প্রভুত্বসুলভ মানসিকতা, বেসরকারি সংগঠনের অনান্তরিক কাগুজে, প্রচারসর্বস্ব ও চাকচিক্যময় তৎপরতা, হাওর ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি লোকজনের সীমাহীন দুর্নীতি গত এক যুগে টাঙ্গুয়ার সব ধরনের সম্পদ পাইকারি হারে লুণ্ঠন করতে সহায়তা করেছে। গণস্বার্থে প্রণীত একটি নীতিমালার মৃত্যু আমরা সকলেই চেয়ে চেয়ে দেখলাম। এই ব্যবস্থাপনায় হাওরের প্রাণভোমরা হাওরবাসীকে হাওরের সম্পদ পাহাড়ার কাজে নিয়োজিত করা যায়নি একেবারেই। উলটো হাওর তীরবর্তী গ্রামের চোরা জেলেরা প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিতদের অনৈতিক সহায়তায় হাওরের মাছসহ অন্যান্য সম্পদ লুণ্ঠনে সীমাহীন পারঙ্গমতা দেখিয়েছে। মূলত টাঙ্গুয়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনাকালীন সময়ে সম্পদ রক্ষা করতে না পারার পিছনে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত না করার বিষয়টিই প্রধান নিয়ামক ছিল বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
৪। সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনার এই দুর্বলতাকে সুচতুরভাবে কাজে লাগিয়ে আগের ইজারাদার-বিনিয়োগকারীরা আবারও টাঙ্গুয়ার হাওরের সম্পদ লুণ্ঠনের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। পরিসংখ্যানের সহায়তা নিয়ে তারা বুঝানোর চেষ্টা করছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনার আগে টাঙ্গুয়ায় মাছ, গাছ, পাখি সবকিছুই বেশি ছিল। তাদের পরিসংখ্যান অনেক ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু তারা যে বিষয়টি উল্লেখ করছেন না সেটি হলো, এই হাওর লুটের জন্য দায়ী দুর্নীতি ও অদক্ষতা নামক সর্বগ্রাসী রাহুটির কথা। দুর্নীতি, উন্নাসিকতা, রুটিন মানসিকতা, অদক্ষতা ইত্যাদির দায়ভার চাপিয়ে তারা ভূতের পিছনে হাটার মতো আবারও আশির দশকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন। এর বাইরে আরেকটি মহল সরকারি ব্যবস্থাপনার মধু আহরণেও ব্যস্ত রয়েছেন বলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এরা হাওরের সাথে সম্পর্কহীন, হাওর পরিবেশ-কৃষি-উৎপাদন সম্পর্কে অজ্ঞ, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বাইরে বসবাসকারী একটি সুবিধাভোগী মহল। আগের কতিপয় এনজিও বিশেষ ও এদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। এদের ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে।
৫। মনে রাখা দরকার সরকারি তহবিলে পাঁচ/দশ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের চাইতেও জরুরি বিষয় হলো টাঙ্গুয়ার হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও এই হাওরের সাথে জড়িত সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা সাধন। টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনার জন্য আলোচনার সময় এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সবচাইতে জরুরি। আমরা মনে করি তাই আলোচনাটি শুরু করা উচিৎ একেবারে নি¤œস্তর থেকে। গত এক যুগের ব্যর্থতার কারণগুলো তুলে আনতে হবে তৃণমূল থেকে। হাওর ব্যবস্থাপনার জুৎসই ধারণাটিও সংগ্রহ করা উচিৎ ওই তৃণমূল থেকেই। তাই আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার পরিবর্তে এই ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বটম টু টপ নীতি গ্রহণ করা উচিৎ। আজ আপনারা যেসব বিজ্ঞ ব্যক্তি এখানে উপস্থিত রয়েছেন তাঁরা টাঙ্গুয়ার হাওরের চার পাশের প্রতিটি গ্রামে গিয়ে জেলে-কৃষকদের কথা শুনুন পালা করে। তাদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করুন ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার মডেল বিষয়ে। এটি হুট করে হয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। এবারের পুরো শীত মওসুম এই কাজে ব্যয় করুন। প্রাপ্ত জনমত বৈজ্ঞানিক পন্থায় বিশ্লেষণ ও একত্রিত করুন। জনমতের ভিত্তিতে জনচাহিদার পরিপূর্ণ রূপরেখা তৈরি করে সর্বসমক্ষে প্রকাশ করুন। এরপর এই রূপরেখা নিয়ে যান বিশেষজ্ঞদের কাছে। বিশেষজ্ঞ বলতে মৎস্য, পাখি,  উদ্ভিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীসহ অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞানী ও কৃষক সংগঠকদের বুঝানো হচ্ছে। সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনা মডেল বেরিয়ে আসবে সেটিই হতে পারে গ্রহণযোগ্য।
৬। সকলকে আরেকটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে। টাঙ্গুয়ার ৫১টি বিল ব্যতিত জেলার অন্যান্য বিল-জলাশয়গুলো এখন ইজারাপ্রথার আওতায়ই পরিচালিত হচ্ছে। ইজারাদারি প্রথায় এখন ইজারাদারদের লোভ অতীতের সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ইজারাদাররা সেচযন্ত্র দিয়ে জলাশয় শুকিয়ে মাছের পোনা পর্যন্ত তুলে আনছেন। এমন কোন জলাশয় নেই যেখানে মাছের প্রজনন বা উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।  এরকম সর্বগ্রাসী লোভী ইজারাবৃত্তির মাধ্যমে টাঙ্গুয়ার হাওরের সম্পদ রক্ষার চিন্তা এখন বোকার স্বর্গ বাসের নামান্তর। বিনিয়োগপ্রথায় কঠোর তদারকি আরোপের নামে বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হচ্ছে। বেড়া ধান খেয়ে যায় বলে একটি প্রবাদ রয়েছে আমাদের সমাজে। এক্ষেত্রে এরকমভাবে তদারকি কাজে নিয়োজিত পক্ষগুলোর মধ্যে আঁতাত হয়ে একটি বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে মাত্র, এর বেশি কিছু নয়।
৭। আশা করি টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা মডেল নিয়ে নুতনভাবে যে আলোচনার সূত্রপাত হচ্ছে সেখানে গণমুখীতার বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেয়া হবে। প্রগতি হচ্ছে ইতিবাচক অর্থে সামনের দিকে গতিপ্রাপ্ত হওয়া। এর বিপরীতটি মানে পিছিয়ে পড়া । পিছিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থা কোন কালে উন্নতি সাধন করতে পারেনি।