করোনার তৃতীয় ধাপের আক্রমণ বাংলাদেশে জোরালো আঘাত হানা শুরু করেছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুসংখ্যা বাড়ছে। ইতোমধ্যে আক্রান্ত শনাক্তের হার শতকরা ৩০ এর উপরে উঠে গেছে। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অধস্তন আদালতসমূহের কাজ ভার্চুয়ালি সম্পন্ন করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। অফিসসমূহ অর্ধেক জনবল দিয়ে পরিচালনা করার জন্য সরকার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন। কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে। সরকারের এমন পদক্ষেপ এর আগের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সময়ও দেখা গেছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে টিকার বাইরে সর্বোত্তম প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলÑ মাস্ক পরিধান করা। যখন করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে তখন মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন, পরবর্তীতে এই সতর্কতায় ক্রমশ শিথিলতা দেখা যেতে থাকে। শিথিলতার সর্বশেষ পর্যায়ে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে একেবারে উদাসীন অবস্থায় চলে যেতে দেখা যায়। করোনার প্রকোপ যখন কমার দিকে ছিল তখনও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মাস্ক পরিধানের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। কিন্তু মানুষ এই অতিগুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাবলয় ব্যবহারে একেবারেই উদাসীন হয়ে উঠেছেন। এখন যখন সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে শুরু করেছে তখনও রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, হোটেল-রেস্তুরা, যানবাহনে; সর্বত্র সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় খুব কম দেখা যায়।
করোনা মহামারী ঠেকাতে পুরো বিশে^র হিমসিম অবস্থা গত ৩ বছর যাবৎ। স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানীরা টিকা আবিস্কারের পর কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। কিন্তু এই টিকাই যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটি এখনও প্রমাণ হয়নি। এখনও বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ভাইরাসের রূপান্তর ঘটছে দ্রুত। ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন ধরনের রূপান্তর ঘটার আশংকা করা হয়। সুতরাং খুব দ্রুত করোনা ভাইরাসের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এরকম অবস্থায় জীবন ও জীবিকার মধ্যে একটা সমন্বয় সূত্র ঠিক করা দরকার। আর এই সমন্বয়-সূত্রটি হচ্ছে টিকা গ্রহণ ও মাস্ক পরিধান। সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে ঘরে বসে থাকলে জীবন বাঁচানো যাবে না, এই সত্য বিশ^বাসী বুঝে গেছে। করোনার কারণে বিশ^ব্যাপী তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোই হবে সামনের দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। তাই করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির সময়েও এখন সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়নি। বরং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার কারণে। তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলে দেয়ার দবি জানিয়েছেন। করোনার কারণে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের মহাসর্বনাশ ঘটে গেছে। সর্বনাশের এই মাত্রা আর না বাড়ানোর আকুতি সকলের। সরকার সব বিষয়ে সচেতন রয়েছেন। আশা করা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত শীঘ্রই জানা যাবে।
টিকা গ্রহণের গতি বাড়াতে হবে। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজ করে গণটিকা কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখতে হবে। আমাদের ধারণা শিক্ষিত ব্যক্তিদের অধিকাংশই টিকা কার্যক্রমের আওতায় এসেছেন। তাই এখন সাধারণ মানুষের টিকা গ্রহণের বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। প্রথামাফিক রেজিস্ট্রেশনের জন্য যে বাধ্য-বাধকতা, তা সহজিকরণের জন্য নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। নতুবা রেজিস্ট্রেশন ভীতির কারণে সাধারণ মানুষ টিকা বলয়ের বাইরে থেকে যেতে পারেন। আর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে মাস্ক পরিধানের উপর। এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে যেতে হবে। ঘরের বাইরে যে কেউ মাস্ক ছাড়া বেরোলেই তাকে জেল-জরিমানার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মানুষের মঙ্গলের জন্যই এসব বিষয়ে নমনীয় মনোভাব ত্যাগ করা প্রয়োজন। মানুষকে মাথায় রাখতে হবে, পরিস্থিতি ্নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আবারও লকডাউন পরিস্থিতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লকডাউন মানেই সীমিত আয়ের মানুষের দুর্ভোগ যন্ত্রণা বেড়ে যাওয়া। এই পরিণতি রোধেই সচেতনতা বাড়াতে হবে নিজেদের।

