পুলক রাজ
যদি জনসংখ্যার একটা বড় অংশ টিকা নেন, তাহলে রোগের বিস্তার বা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এর ফলে যাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাও রোগের কবল থেকে রক্ষা পান। কিন্তু এই ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন ঘটলে সেটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় দেড় বছর যাবত করোনা ভাইরাসের জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মানুষের চলাচল করতে হচ্ছে। যতদিন যাচ্ছে করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য ভ্যাকসিন আনা হয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সারাদেশে গণটিকা কার্যক্রম শুরুর পর মানুষের মধ্যে টিকা গ্রহণে আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকাসহ শহরের অনেক এলাকায় এখনো টিকার ব্যাপারে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। টিকা কর্মসূচির আওতার মধ্যে পড়লেও অনেকেই জানেন না টিকা কোথায় দিচ্ছে, কীভাবে পাওয়া যাবে। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, টিকা নিয়ে অনেকে তেমন কোন তথ্যই জানেন না। টিকা নেবেন কিনা তা নিয়ে কারো কারো মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে এখনো।
সরেজমিনে পৌর শহরের পশ্চিম বাজার এলাকার ওমরগণী কলোনী ও আশপাশে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এর আগেও জেলায় টিকা গ্রহণে আগ্রহী কম থাকার কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় আসা টিকার প্রায় ২২ হাজার ডোজ ফেরত গিয়েছিলো। এজন্য সকল জনপ্রতিনিধিসহ সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা নিজে টিকা গ্রহণ করে অন্যকে টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
জানা যায়, ওমরগণী কলোনীতে প্রায় ২০ টি পরিবার রয়েছে। এরমধ্যে ২৫-৩০ জন রয়েছেন যারা টিকা নিতে পারবেন। কিন্তু তারা কেউই করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের টিকা গ্রহণ করেননি। ওদের মধ্যে কেউ রিকশা চালায়, কেউ আবার ঝালমুড়ি, শরবত, আমড়া, মটর, বাদাম বিক্রি ও ফুটপাতে নানা ধরনের ছোটখাটো ব্যবসা করে কোন মতে সংসার চালায়।
কলোনীর মো. ইসমাইল বলেন, আমার পরিবারের কেউই এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। আমাদের কলনীতে করোনা ভাইরাস বলতে কিছু নেই। আমাদের করোনা ভাইরাস হইসে না, তাহলে কেন করোনা ভাইরাসের টিকা গ্রহণ করবো। টিকা দেওয়ার কোন দরকার নাই। শুনেছি অনেকেই বলেছে করোনা ভাইরাসের টিকা দিলে নাকি শরীরের জটিল সমস্যা হয়। পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর বা শহরের সচেতন নাগরিকরাও তো আমাদের বলছেন না টিকা গ্রহণের কথা।
মো. ফারুক মিয়া বলেন, করোনা ভাইরাসের জন্য সরকার দেশে লকডাউন দিসে। আমাদের মতো লক্ষ লক্ষ গরীবের পেটে লাথি পড়ছে। নিজে খাবো না পরিবারকে খাওয়াবো। সরকার যা চাচ্ছে তাই করছি। স্যানিটাইজার ও মাস্ক ব্যবহার করার কথা বলছে তা সঠিক ভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছি। এখন আবার শুনতাছি ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলছে। ভ্যাকসিন কি? কেমনে দেওয়া লাগে? কই গিয়া দিতে হয়। তা কিছুই তো জানি না। গতবার তো মানুষ মাস্ক, স্যানিটাইজারসহ খাবারও দিসে। কিন্তু এবছর তো কেউ আইসা কিছুই বলছে না।
মো. শাহ্ আলম বলেন, আসলে আমাদেরকে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলেন নাই। পড়ালেখা জানলে আমরা তো কেউ ঝালমুড়ি আর বাদাম, শরবত বিক্রি করতাম না। দেশে মহামারি শুরু হয়েছে। কিন্তু কেউ সহযোগিতাও করছে না। ভ্যাকসিন দিতে গেলে কম্পিউটার দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। আমরা কম্পিউটার কই পাবো। আমরা কেমনে নিবন্ধন করবো তাও জানি না। আবার অনেকের কাছ থেকে শুনছি ভ্যাকসিন দিলে নাকি শরীরের ক্ষতি হয় কারটা বিশ^াস করবো বুঝতে পারছি না।
সুহেল আহমদ বলেন, ২০২০ সাল থেকে শুনে আসছি করোনা ভাইরাসের রোগের কথা। কই এখন পর্যন্ত আমি তো আক্রান্ত হইলাম না। জ¦র হইলে নাপা খাইলেই কমে যায়। আমার মতো গরীবের জন্য করোনা ভাইরাস নাই। তিনি বলেন, সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। কয়দিন পরপর লকডাউন দেয়। এরমধ্যে নিয়ম করে চলার কথা বলছে। আমাদের মতো মানুষ কেমনভাবে এসব নিয়ম কানন মানবো। তারপরও চেষ্টা করে যাচ্ছি মানার। মাস্ক পড়ার কথা কয় সরকার। মাস্ক পরা শুরু করলাম। এখন আবার কয় ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা। করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন নামই শুনছি। কেমনে দিতে হয় তা জানি না।
স্বপ্নডানা’র চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বস্তি ও নিম্ন আয়ের মানুষ করোনা ভাইরাসের টিকা দিতে ভয় পায় এটা সত্য। তাদের কাছ থেকে আগে ভয় ভীতি দূর করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন সহজে টিকা দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শহর এবং গ্রামের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটা করে নিবন্ধন বুথ খোলার প্রয়োজন। যেখানে স্বেচ্ছাসেবকরা নিবন্ধন করতে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে পারে। এদেরকে ক্যাম্পেইন করে আগ্রহী করে তুলতে হবে। যেন তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি মানুষ টিকা কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে।
শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন, করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যেহেতু সুযোগ এসেছে করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়ার, সুযোগ কাজে লাগিয়ে সবাইকে টিকা গ্রহণ করতে হবে। ওমরগণী কলোনিসহ শহরের নিম্ন আয়ের মানুষকে টিকার ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে এবং মানুষকে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও শহরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এগিয়ে আসতে হবে।
৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবাবিল নূর বলেন, করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন দিতে অনেকেই রাজি হয় না। তারপরও সচেতনামূলক কথাবার্তা বলে চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানুষকে টিকা গ্রহণের নিবন্ধন করাচ্ছি। তিনি বলেন, আমি কলনীতে যাবো, তাদেরকে টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য।


