রমজানের ৬ দিন পেরিয়ে গেলেও সুনামগঞ্জে ন্যায্যমূল্যে টিসিবি’র পণ্যমূল্য বিক্রি শুরু হয়নি। কয়েকদিন আগে এ নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই সংবাদে টিসিবি’র বরাত দিয়ে জানানো হয়েছিল যে, সুনামগঞ্জের কোন টিসিবি ডিলার পণ্য বিক্রির জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তারা আরও বলেছেন যে, সুনামগঞ্জের পণ্য আনার খরচ বেশি, এই খরচ করে পণ্য এনে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে ডিলারদের কোন লাভ হয় না, এজন্যই তাদের অনাগ্রহ। জেলায় পণ্য বিক্রি শুরু না করার জন্য টিসিবি’র এই ব্যাখ্যা অগ্রহণযোগ্য এবং দুঃখজনক। সরকার পবিত্র রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি কর্মসূচী শুরু করেছেন। সারা দেশে এই কর্মসূচী ইতোমধ্যে ভাল ফলও বয়ে এনেছে। ক্রেতা সাধারণও এতে সন্তুষ্ট হয়েছেন। এরকম অবস্থায় সুনামগঞ্জের মানুষকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা একটি অনুচিত কাজ।
স্বাধীনতার পর টিসিবি সারা দেশে বিক্রয় নেটওয়ার্ক স্থাপন করে সকলের নজর কেড়েছিল। একই সাথে দেশব্যাপী বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কে দুর্নীতির বিস্তারও ঘটেছিল। পরবর্তীতে টিসিবিকে সংকুচিত করে ফেলা হয়। এখন তো টিসিবি নামক সরকারি প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব কাগজে-পত্রে নামে মাত্র টিকে আছে। ব্যবসায়-বাণিজ্য খাতে অপরাপর সরকারি সংস্থার মতো (রেলওয়ে, বিআরটিসি, রাষ্ট্রায়ত্ব বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক,বীমা ইত্যাদি) টিসিবিকেও অকার্যকর করে রাখার পরিকল্পনা সামনে রেখেই সরকারি কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে। এতে বাজারের ভারসাম্য লঙ্ঘিত হয়। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে মুনাফার পাহাড় গড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের জীবনে চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, চিনিসহ অপরিহার্য কিছু নিত্যপণ্য রয়েছে যার বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন দেশে সরকারি উদ্যোগ আছে ব্যাপকভাবে। শ্রমজীবী ও বিত্তহীন লোকেদের জীবনমানকে ন্যুনতম স্বস্তির মধ্যে রাখতেই সরকার এসব উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আমাদের মতো দেশে যেখানে দারিদ্রতার মাত্রা এখনও প্রকট, যেখানে দারিদ্র বিমোচন করা অন্যতম জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় সেখানে এইসব নিত্যপণ্যের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি আবশ্যকীয় কাজ। কিন্তু সরকার কেন যে এই জায়গায় ব্যবসায়ীদেরকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন তা বোধগম্য নয়।
দারিদ্র বিমোচনের জন্য সরকারের বৃহৎ আকারের নানা কর্মসূচী ও প্রকল্প চলমান আছে। এসব প্রকল্প/কর্মসূচীর মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হচ্ছে। এর সুফলও পড়েছে সমাজে। সমাজ থেকে দারিদ্রতার মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি এইসব কর্মসূচীর সাথে যদি বাজারের আগ্রাসী চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো তাহলে দারিদ্রতা নিরসনের মাত্রা আরও গতি লাভ করত। কারণ বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ শেষ পর্যন্ত বাজারেই আসে। বাজার যদি নিজের লুটেরা চরিত্রের মাধ্যমে এই অর্থ যথেচ্ছ লুটপাট না করতে পারে তাহলে ওইসব মানুষের জীবন ও জীবিকা আরও অনেক স্বস্তিদায়ক হতো। দেশের দারিদ্র বিমোচনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারেন। সমবায় বাজার গড়ে তুলে সাধারণ মানুষকে কিছুটা রক্ষা করার জন্য একটি সরকারি উদ্যোগ কাগজেপত্রে আছে। একসময় সমবায় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের ধান ক্রয় এবং পরে এ থেকে অর্জিত মুনাফা কৃষকদের মাঝে বণ্টনের একটি কর্মসূচী (মুক্তা প্রকল্প) চালু ছিল। মাথামোটা প্রতিষ্ঠানের শম্ভুকগতি, দুর্নীতি ও সৃজনশীলতার অভাবে এগুলোও প্রায় পরিত্যক্ত। আসলে সমাজের দারিদ্রতা হটানো একটি ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। বিভিন্ন সেক্টরে এর জন্য কাজ করার সুযোগ রয়েছে। খ-িত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দারিদ্রতা দূর করা কঠিন বিষয়। টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্য বাজারজাত করা ওই কাজেরই একটি অংশ মাত্র।

