টেকেরঘাট টু বড়ছড়া, প্রাণ বাঁচাতে অজানার পথে

সালেহ আহমদ আলমগীর
(পর্ব-২)
রাত নেমেছে একটু আগে। কৃষ্ণপক্ষ, চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশপাশের বাসাগুলোতে অস্থির হৈচৈ। অমুক কোথায় গেল, তমুককে তো দেখছি না! এই ব্যাগটা আবার সাথে নিচ্ছো কেন! গয়নাগুলো নিয়েছো তো! আরে জুতা খুঁজতে হবে না, স্যান্ডেলই পড়ে নাও! দেরী করো না। দেখছো না, পাশের বাসার ভাবীরাও রওয়ানা হয়ে গেছেন। আশপাশ থেকে এ জাতীয় কথাবার্তা কানে আসছে। আমরাও দ্রুত তৈরী হচ্ছি। হঠাৎ খেয়াল হলো, কোন পথে আমরা ভারতে ঢুকবো সেটাইতো এখনও জানা হলো না। যদিও তিনশ’ ফুট দূরেই সীমান্ত, কিন্তু এদিক দিয়ে তো ভারতে ঢোকা যাবে না। লোকালয় নেই, চলার মতো পথ নেই, দুর্ভেদ্য বন জঙ্গল আচ্ছাদিত খাড়া পাহাড়, হিং¯্র জন্তু-জানোয়ারÑ না, এদিক দিয়ে একবোরেই অসম্ভব। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলে বললেন, আপাতত বড়ছড়া বাজারের পাশ দিয়ে গিয়ে ভারতে ঢুকতে হবে। একটু উপরে বি.এস.এফ. ক্যাম্প আছে, ওই জায়গাটাই নিরাপদ হবে। মামাতো, খালাতো আর নিজের ভাই বোন মিলিয়ে ছোটরা ১৪-১৫ জন। ৫ মামা ও মামাতো বড় ভাইরা মিলে সমর্থ পুরুষ ৭-৮ জন। মাইল খানেক দূরত্ব, তেমন সমস্যা হবে না। নানু, মামী, খালা আর আম্মাকে নিতেই যা একটু কষ্ট হবে। ঘরে তালা লাগিয়ে বিসমিল্লাহ বলে বেরিয়ে পড়লাম সবাই। আম্মা আমার হাতে একটা মাঝারি সাইজের স্যুটকেস ধরিয়ে দিয়ে বললেন, কিছুতেই হাতছাড়া করবি না। এক প্রস্ত কাপড়ের সাথে নগদ টাকা আর আম্মার গয়নাগুলো আছে এর ভেতরে। স্যুটকেসটা মাথায় নিয়ে ছোট বোনদের একজনকে হাতে ধরে রওয়ানা হলাম। পথে নেমেই থামতে হলো। এম.পি. নানু (আব্দুর জহুর এম.পি.এ. সাহেব সম্পর্কে আমার নানা হন, তাঁর স্ত্রী, আম্মার ফুপু) তাঁর ছেলে মেয়েদেরকে আব্বার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেনÑ এদেরকে আপনার হাতে সঁপে দিলাম। আপনাদের যে গতি হয় এদেরও তাই হবে, আমি যাচ্ছি না। জানা গেল, এম.পি. নানা গোঁ ধরেছেন। তাঁর এক কথাÑ পাঞ্জাবিদের গুলিতে প্রাণ গেলে যাবে, তিনি বাংলাদেশেই মরবেন, সহযোদ্ধাদের ফেলে রেখে কিছুতে ইন্ডিয়া যাবেন না। নানাকে ছেড়ে তাই নানীরও যাওয়া হচ্ছে না। শাশুড়ি-জামাই সম্পর্কের জড়তা ভুলে গিয়ে এক ঝটকায় নানীকে আম্মার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আব্বা বললেন তোমরা এগোও, দেখি ব্যাটা না এসে থাকেন কী করে। এম.পি. নানা, সম্পর্কে আব্বার ফুপা-শ^শুর হলেও বয়সে বছর দুয়েকের ছোট। নানাকে বোঝানোর জন্যে তাঁর বড় মেয়ে স্বপ্না খালাকে সাথে নিয়ে আব্বা দৌড় দিলেন নানার বাসার দিকে। আর এদিকে আমরা দ্রুত পা চালালাম বড়ছড়ার উদ্দেশ্যে। অল্প সময়ের মাঝেই স্বপ্না খালাকে নিয়ে আব্বা ফিরে এলেন। নানাকে আনতে পারেননি। কিছুতেই ইন্ডিয়া যাবেন না তিনি। একহাতে মেয়ের বয়সী স্বপ্না খালা আর অন্য হাতে বড় মেয়ে নাজমাকে ধরে আব্বাও সঙ্গী হলেন পরিবারের সাথে।
কলোনি থেকে বেরিয়ে পূর্বমুখি রাস্তাটায় উঠলাম। নানা বয়সের বহু মানুষ। একে ডাকছেন ওকে বকছেন আর ত্রস্ত পায়ে ছুটে চলেছেন। সবার গন্তব্য আপাতত বড়ছড়া। আসলে মানব কাফেলায় নিজেকে সঁপে দিয়ে এক অনন্যোপায় পথচলার শুরু এটা। তখন ছোট ছিলাম, বড়দের আদেশ-নির্দেশ তামিল করে গেছি কেবল, কোনো বিষয়ে নিজেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি। আজকের এই বয়সে এসে বুঝতে পারি, কীরকম কঠিন একটা সময় পার করেছেন সেদিন বড়রা। কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় থাকবেন, কতদিন থাকতে হবে, আর কি দেশে ফেরা হবেÑ কতরকম অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার বোঝাই না ছিল সেদিন তাঁদের মনে। এদিকে আমার মাথায় দুশ্চিন্তা নয়, স্যুটকেসের বোঝা। পাশাপশি হাঁটছি পরিবারের সবার সাথে, আর বার বার তাকাচ্ছি নানুর দিকে, আম্মার দিকে। হঠাৎ খেয়াল করলাম একটা লঞ্চের আওয়াজের মতো কিছু শোনা যাচ্ছে। সবাই একটু থেমে গিয়ে কান পেতে ভাল করে শোনার চেষ্টা করলেন। শব্দটা লঞ্চেরই, দক্ষিণ দিক থেকে আসছে। খুব ধীরে হলেও একটু একটু করে বাড়ছে। তবে কি পাকিদের গানবোটটা টেকেরঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে? ভয়ের একটা ঠান্ডা ¯্রােত যেন শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। আর তখনই ডাম্পের বাজারের দিক থেকে শোনা গেল কয়েকটা গুলির শব্দ। সিগনেল-ফায়ার?
চোখভরা আতঙ্ক নিয়ে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছি। কিছু বুঝে উঠবার আগেই হাতের ডানে দক্ষিণ দিকে হাওড়ের গোটা পাড় জুড়ে যেন কেয়ামত নেমে এল। খই ফোঁটার মতো শুরু হলো গুলির শব্দ। রাইফেলের সিঙ্গেল শট, মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার আর মাঝে মাঝে মর্টারের গোলা। এ বিশ^ চরাচরে যেন আর কোনো শব্দ নেই, শুধুই গোলাগুলির শব্দ। আমরা বুঝে নিলাম পাকিরা টেকেরঘাট আক্রমণ করে বসেছে। পুরো রাস্তাটা খোলামেলা জায়গায়, কোনো দিকে বাড়িঘর, গাছপালা বা আড়াল বলতে কিছু নেই। কাউকে বলে দিতে হলো না, মুহূর্তের মধ্যে সবাই রাস্তাটাকেই আড়াল করে উত্তর পাশে নিচে নেমে গেলাম। ভাগ্যিস, সে রাতে বৃষ্টি ছিল না। রাস্তার তিন-চার ফুট নিচে অসমান ভূমি। কোথাও ক্ষেত, কোথাও কাদা, কোথাও শুকনো মাটি। শুরু হলো উবু হয়ে দৌড়। গুলি চলছে, আমরা দৌড়াচ্ছি। পরিবারের বাকিরা কে কোথায় আছেন, সামনে না পেছনে, পড়ে গেলেন নাকি উঠে দাঁড়ালেন, দেখার সুযোগ নেই। প্রচন্ড আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদছি। মাথায় স্যুটকেস, হাতে শক্ত করে ধরা বোনের হাত, আর দৃষ্টি আম্মা-নানুদের দিকে। হোঁচট খেয়ে পড়ছি, উঠেই আবার দৌড়াচ্ছি। কখন কীভাবে যে প্রায় এক মাইল জায়গা পার হয়ে বড়ছড়া বাজার পেরিয়ে ইন্ডিয়ার ভেতরে ঢুকলাম জানি না। কোন যাদুবলে যে আম্মারা এতটা পথ দৌড়াতে পারলেন আজও আমার কাছে সে এক বিষ্ময়। খুঁজে পেতে পরিবারের সবাইকে একত্র করা গেল। আমরা ছাড়াও বহু মানুষ, রাস্তায় যারা আমাদের সাথে ছিলেন, জড়ো হয়েছেন জায়গাটাতে। সবাই পাহাড়ের বা কোনো টিলার আড়াল খুঁজছেন। একটা ছোট ছড়ার পাড়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আমাদের পরিবারের সবাই আশ্রয় নিলাম। মাথার কিছুটা উপরে বি.এস.এফ. ক্যাম্প। সীমান্ত পেরোলেও ভয় কাটছে না। এ রকম পরিস্থিতিতে মাথাও কাজ করে না। কত আজগুবি চিন্তাই না আসে মনে। পাকিরা যদি সীমান্ত পার হয়ে এখানে চলে আসে! দূর, তা’ কী করে হয়!
গুলির শব্দ এখনও শুনতে পাচ্ছি। তবে কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে। ঠুশ-ঠাশ, মাঝে মাঝে এক পশলা ব্রাশ ফায়ার। এমনি এক জবুথবু অবস্থায় হঠাৎ বিষ্ময়ভরা চোখে দেখলাম আশ্চর্য এক দৃশ্য। মাথার উপরের বি.এস.এফ. ক্যাম্প থেকে আগুনের শিখার মত অলৌকিক কিছু যেন দক্ষিণে তাহিরপুরের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। একটার পর একটা। সাথে ঠা ঠা শব্দ। পরবর্তীতে বড় হয়ে ওয়ার-মুভিতে রাতের আকাশ-চেরা ভারী মেশিনগানের এ রকম শেলিং বহুবার দেখেছি, কিন্তু চর্মচোখে দেখা সেই প্রথম আর সেই শেষ। ভাষায় বর্ণনাতীত এক অভিজ্ঞতা। কতক্ষণ শেলিং হয়েছিল মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছেÑ শেলিং-এর শব্দ থেমে যেতেই গোটা প্রকৃতিও যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুনশান নিরবতা যাকে বলে। টেকেরঘাটের দিক থেকেও আর গোলাগুলির আওয়াজ নেই। এতগুলো মানুষ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, অথচ সবাই যেন বোবা, নিশ^াসও নিচ্ছেন না! শিশুরাও যেন কাঁদতে ভুলে গেছে। চারিদিকে এক অসহ্য নিরবতা। এক সময় ধীরে ধীরে সবকিছু জ্যান্ত হতে থাকল। এক ভদ্রলোকের কথাতেই যেন সবাই জেগে উঠলেন। মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক। পরে জেনেছি তিনি বি.এস.এফ.- এর একজন জে.সি.ও.। ‘স্খলিত পায়ে’ আশ্রয় নেয়া লোকজনের মাঝে হাঁটছেন। সবাইকে আশ^স্ত করছেন আর অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ‘জড়ানো গলায়’ বলছেনÑ “আপলোগ মাত ঘাবরাইয়ে। আগার পাকিস্তানি ফৌজ ইঁধার আঁয়ে তো হাম উনকো গোলি নেহি করুঙ্গা, লেকিন ক্যাচ করুঙ্গা”। তাঁর আশ^াসবাণীতে যেন কাজ হলো। সেই সাথে এটাও বোঝা গেল, গুলি খেয়ে মরার ভয় আর এখন নেই। সবাই নড়ে চড়ে বসলেন, গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে এদিক ওদিক রাত্রি যাপনের জায়গা খুঁজতে চললেন। আর আব্বা চললেন হতাহতের খোঁজ নিতে। জানা গেল Ñ টেকেরঘাট থেকে দৌড়ে আসার সময় পড়ে টরে গিয়ে অনেকে সামান্য আহত হলেও, আশ্চর্যের বিষয়, গুলিতে হতাহত হননি কেউই। সবাই ধরে নিলেন রাস্তাটার আড়ালে থাকাতেই এ যাত্রা বাঁচা গেছে। খবর এলো, টেকেরঘাটেও কেউ গুলিবিদ্ধ হননি। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল, পাকিরা টেকেরঘাট বা ডাম্পের বাজার পর্যন্ত আসতেই পারেনি। দক্ষিণ দিকে বেশ কিছুটা দূরে ছিল ওদের অবস্থান। আমাদের আর ওদের মাঝখানে কয়েকটা গ্রামের বেষ্টনি থাকায় ওদের ছোঁড়া গোলা-গুলি আমাদের অবস্থান পর্যন্ত খুব একটা পৌঁছাতে পারেনি। এমনও হতে পারে, হয়তো ওই মাত্রার ফায়ারিং ওরা করেইনি। হাওড়ের পাড় ঘেঁষে পজিশন নিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র থেকেই হয়েছিল মূলত এই খই-ফোঁটানো শব্দ। দক্ষিণ দিকে পাকিদের অবস্থান আন্দাজ করে বিরতিহীন গর্জে চলেছিল তাঁদের অস্ত্র। হয়তো প্যানিক্ড হয়ে গিয়েছিলেন। এ রকম পরিস্থিতিতো আর ফেস করেননি এর আগে। লঞ্চের ক্রমবর্ধমান আওয়াজ কিংবা ডাম্পের বাজারের দিক থেকে শোনা গুলির শব্দও খই-ফোঁটানোর কারণ হতে পারে।
ছড়ার পাড়ে স্যাঁতসেঁতে মাটির উপর পোকা মাকড় আর জোঁকের মাঝখানে কতক্ষণ আর থাকা যায়। কোনো ঘর- বাড়ি, নিদেন পক্ষে একটা উঠোনের খোঁজে আমরা পাহাড়ের ঢাল থেকে সমভূমিতে নেমে এলাম। প্রশাসনিকভাবে বড়ছড়া ভারতের একটা থানা কিনা জানি না, তবে এখানে একটা পুলিশ স্টেশন আছে যে টি থানা নামেই পরিচিত। সরকারী কিছু অফিস কাচারী এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে আছে। এই রাতের বেলা সবগুলোর দরজাই বন্ধ। তবে প্রায়গুলোতে খোলা বারান্দা আছে। ইতোমধ্যে লোকজন কয়েকটাতে রাত কাটানোর আয়োজন করতে লেগে গেছেন। তেমনি একটা বারান্দায় আমরাও আশ্রয় নিলাম। সে রাতে খাবার কিছু জুটেছিল কি না মনে নেই। পরিশ্রান্ত ছিলাম, সকাল থেকে ঘটে যাওয়া সবকিছু মনে করতে করতে এক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। (চলবে)
লেখক : চিকিৎসক