‘ঠান্ডা মাথার খুনি তৌহিদ’

বিশেষ প্রতিনিধি
অভিক (রেদওয়ান ইসলাম অভিক) এখনো ঘুমোতে পারে না, স্বপ্ন দেখে তৌহিদ দা নিয়ে তাকে জবাই করতে আসছে, গভীর রাতে চিৎকার দিয়ে মা রেজুয়ানা খাতুন ও বাবা রফিকুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে, ‘তোমরা আমাকে বাঁচাও’।
অভিকের বাবা তাহিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো জানালেন।
অভিকের বাম হাতের কব্জি কর্তন এবং ডান চোখ নষ্ট করে দেবার পর ৬ বছর জেল কেটেছে তৌহিদ (তৌহিদ মিয়া)। তাহিরপুর উপজেলার ভাটি তাহিরপুর গ্রামের আফাজ উদ্দিনের ছেলে সে।
৩ মাস হয় জেল থেকে বেরিয়ে এসে আরেক শিশুকে সোমবার জবাই করেছে সে। অভিকের বাবা মনে করেন, তৌহিদ ঠান্ডা মাথার খুনি। তাকে মুক্তি দিলে যে কোন শিশুকেই ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে সে।
রফিকুল ইসলাম জানালেন, ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮ টায় বাড়ি’র পাশের শনির হাওরপাড়ে দাঁড়ানো ছিল ছেলে অভিক। হঠাৎ করেই তৌহিদ দা হাতে নিয়ে অভিকের দিকে তেড়ে আসে। অভিক হাওরের পানিতে পড়ে গেলে তৌহিদ মুহূর্তেই তার ডান হাত ধরে কব্জি কর্তন করে দেয়। এরপর অভিক পানিতে ডুব দিলেও দা দিয়ে কোপাতে থাকে সে। লোমহর্ষক এই ঘটনায় অভিকের ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায়। বাম চোখে তিন মাস দেখতে পায় নি সে। এরপর চারবার অভিকের ব্রেইনে ইনফেকসন হয়েছে, আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে তাকে।
রফিকুল জানালেন, খুনি তৌহিদ তার প্রতিবেশি। ছেলেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি নিয়ে আসলে সে ভয়ে ঘুমোতো না, সারাদিন কেবল কাঁদতো, এরপর ডাক্তারের পরামর্শে স্থান ত্যাগ করেন তিনি, গ্রাম ছেড়ে তাহিরপুর উপজেলা সদরে এসে বাড়ি ভাড়া করেই থাকছেন তিনি। ওখানেও মধ্যরাতে প্রায়ই চিৎকার দিয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে কাঁদে সে।
মঙ্গলবার তৌহিদ জামালগঞ্জে আরেক শিশুকে জবাই করে খুন করেছে। এ ঘটনা শুনে অভিকের আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।
রফিকুল বললেন, ছেলেটি এসএসসি পরীক্ষার্থী, এই সময়ে তার মধ্যে আতঙ্ক কাজ করায় আমি উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, তৌহিদ ঠান্ডা মাথার খুনি। আমার ছেলেকে খুন করার সময় আমার ছেলের পাশে তার নিজের ভাতিজা ও ভাগ্নে ছিল, তাদের আঘাত করে নি সে। অভিক জানিয়েছে, এর আগে থেকেই তাকে স্কুলে যাবার সময় বলতো, ‘তোর স্কুলে গিয়ে লাভ নেই, তোকে মেরে ফেলবো আমি’। অভিককে কোপানোর পর সে নিজেই থানায় হাজির হয়ে বলেছে, সে ওকে (অভিককে) খুন করে এসেছে। সে বুঝেছিল অভিক দায়ের কুপে মারা গেছে।
রফিকুল বললেন, তাকে অপ্রকৃতস্থ বললে ভুল হবে এবং খুনিকে আশ্রয় দেওয়া হবে। অপ্রকৃতস্থ হিসেবে মুক্তি পাওয়ায় জামালগঞ্জে আরেক শিশুর প্রাণ কেড়ে নিল সে। রফিকুল জানালেন, প্রতিবেশি একটি মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করেছিল তৌহিদ, তার আচরণে ওকে ছেড়ে চলে গেছে মাদ্রিয়া নামের ওই তরুণী। তৌহিদ গ্রামের নিরীহ মানুষকে নানাভাবে নির্যাতন করতো বলে জানান রফিকুল।
সোমবার জামালগঞ্জে জবাই করে এক শিশুকে হত্যা করেছে তৌহিদ মিয়া নামের ওই খুনি। সোমবার সকালে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষীপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। খুন হওয়া শিশুর নাম রিহান (৬)। পূর্ব লক্ষীপুর গ্রামের হানিফ উদ্দিনের ছেলে। রিহানের মা শাহীনা বেগম এই ঘটনায় সোমবার রাতে খুনের মামলা দায়ের করেছেন। মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের সিনিয়র চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হেলাল উদ্দিনের আদালতে তৌহিদকে হাজির করলে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়
জামালগঞ্জ থানার ওসি মীর মোহাম্মদ আব্দুন নাসের বললেন, ২৮ বছর বয়সি তৌহিদ মিয়া বগুড়ায় অগ্নিসংযোগ ঘটানোর দায়ে ২০১৩ সালে আসামি হয়েছিলো, একই বছরে তাহিরপুরে মারপিটের ঘটনায় আসামি। তাকে পাগল বলে খুনের মামলা থেকে রেহাই দেবার সুযোগ নেই।
তৌহিদের চাচাতো ভাই এমদাদুল হুদা জানান, ছোট বেলায় নেশা করতো তৌহিদ, এরপর সিলেটে গিয়ে রিক্সা চালায়, ওখানে গিয়ে মাথায় সমস্যা হয়। শীত আসলে মাথার সমস্যা বাড়ে। রফিকুল ইসলামের ছেলেকে দা দিয়ে কোপানোর ঘটনায় জেলে ছিল সে। জেলে থাকার সময় জেল পুলিশ ও অন্য কয়েদিকেও মারপিট করেছে। জেলে থাকার সময় সরকারি উদ্যোগে এবং সিলেটে থাকার সময় তার মায়ের ( তৌহিদের মায়ের) উদ্যোগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।