ঠিকমতো ধান কাটতে পারলে বছরের খোরাক হইবো

সাইদুর রহমান আসাদ
শনির হাওরে আমরা ধান কাটি। আমাদের অভাবের সংসার। হাওরে আইছি বাচ্চা দুই ডারে লইয়া। বিশ-বাইশ দিন ধান কাটতে পারলে এক বছরের খানি খোরাক হইবো। কথাগুলো ধান কাটা শ্রমিক মধু মিয়ার। তিনি তার ছেলেকে নিয়ে শনির হাওরে ধান কাটতে এসেছেন। এই ধান কাটা শ্রমিকদের স্থানীয় ভাষায় বেপারি বলা হয়। বেপারি দুই রকমের। বাইরের জেলা থেকে আসা বেপারি ও আঞ্চলিক বেপারি। এই দুই রকমের বেপারিরা এখন ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সুনামগঞ্জে। সবারই লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব ধান গোলায় তোলা। বিনিময়ে নিজেদেরও বছরের খাবার সংগ্রহ করা।
বেপারি মধু মিয়া ত্রিশ বছর ধরে বৈশাখ মাসে আসলেই ছেলেদের নিয়ে ধান কাটায় লেগে পড়েন। তিনি তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের বিন্নাকুলি গ্রামের বাসিন্দা। অন্য সময় জাদুকাটা নদীতে বারকি শ্রমিকের কাজও করেন তিনি। মধু মিয়া বললেন, আমার তিন মেয়ে ও চার ছেলে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। অন্যরা দিন মজুরের কাজ করে। এখন সবাই ধান কাটছে।
মধু মিয়ার বড় ছেলে আজিজুল হক বললেন, আমি বাবার সঙ্গে ধান কাটতে আসছি। প্রতি বছর এই সময়ে আমরা ধান কাটি। গত বছরেও সারা বছরের খোরাক বাড়ি নিয়ে গেছি। ঘরে আর কিছু না থাকলেও ধান থাকলে চিন্তা থাকে না। ঘরে ধান থাকলে চারটা ভাত খেয়ে তো থাকা যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। হাওর থেকে কৃষকের এই ধান তুলতে ৮ হাজার ৫০০ বেপারি বাইরের জেলা থেকে আনা হয়েছে। এছাড়াও ১ লাখ ৮৫ হাজার আঞ্চলিক বেপারি হাওরে কাজ করছেন। এবছর ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪ মেট্রিক টন।
জানা যায়, হাওরে ধান কাটা এসব বেপারি ধানের ভাগ নিয়ে কৃষকের জমিতে ধান কাটে। এবার কোথাও সাত ভাগ আবারও কোথাও আট ভাগে ধান কাটছে এসব বেপারিরা। কাটার পর মাড়াইকৃত ধান সাত ভাগ করে ছয় ভাগ নেয় কৃষক আর বাকি এক ভাগ নেয় বেপারি। এই নিয়মকে বলাকে বলা হয় সাত ভাগ। খলা থেকে দূরের জমিতে ছয় ভাগেও ধান কাটা হচ্ছে।
বেপারি আব্দুর রাজ্জাক মির বললেন, আমি হাওরে চল্লিশ বছর ধরে ধান কাটি। দশ বছর ধরে ছেলেকে নিয়ে আসি। এক মাস ধান কাটতে পারলে আর চিন্তা করা লাগে না। সারা বছর পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো ভাবে চলা যায়।
আব্দুর রাজ্জাক মিরের মতো ভাগে ধান কাটছেন নূরে আলম, নজরুল ইসলাম, মিলন মিয়া, আব্দুর রশিদ, আজিজুল ইসলাম আলম। তারা সবাই জানিয়েছেন, এই কয়েক দিনের ধান কাটার উপর নির্ভর করবে তাদের আগামী এক বছর। কারণ তাদের নিজের জমি নেই। বৈশাখের এই কয়েকদিন কৃষকের জমিতে কাজ করে খাবারের ধান সংগ্রহ করতে হয় তাদের।
বেপারি মো. বাবুল মিয়া বললেন, আমার ৫ মেয়ে ও ২ ছেলে। বড় দুই মেয়েকে অনেক কষ্ট করে বিয়ে দিয়েছি। ছোট তিন মেয়ের দুই জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও এক মেয়ে মাদ্রাসার পড়াশুনা করছে। আর ২ ছেলে ছোট। বর্তমানে ৭ জন মানুষ পরিবারে রয়েছে। দিন মজুরের কাজ করে পরিবার চালাতে হয়। তাও প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। এই কয়েকদিন হাওরে ধান কাটতে পারলে ছয় মাসের খাবারের ধান বাড়ি নিয়ে যেতে পারবো। আর টুকটাক যা কাজ করি তা দিয়ে বাজার সদাই কিনলেই হবে। অন্তত বৌ সন্তানদের নিয়ে উপবাস থাকতে হবে না।
জমির মালিক মো. আইয়ূব আলী বললেন, আমি সনির হাওর ষোলো কেয়ার (৩০ শতকে ১ কেয়ার) জমি করেছি। ধানও ভালো হয়েছে। এখন সাত ভাগে সতেরো জন বেপারি লাগিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। পুরো জমির ধান কাটার পর খলায় নিয়ে মাড়াই দিবো। মাড়াইয়ের পর ভাগের প্রায় ৩০ মণ ধান তারা নিবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বললেন, ধান কাটতে শ্রমিকরা এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায় যায়। তারা সঙ্গে ছেলে মেয়ে এমন কি অনেক সময় স্ত্রীকেও নিয়ে আসে। আবার অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন জেলা থেকে ধান কাটার জন্য শ্রমিক আসে। আমরা তাদের সহযোগিতা করি। কারণ তারা জানে এখানে ভাগ অনুযায়ী ফসল কাটা হয়। তারা যদি বিশ দিন ধান কাটতে পারে তাহলে তাদের পরিবারের সারা বছরের খাবারের ধান হয়ে যায়। এটা আমাদের সুনামগঞ্জের জন্য দ্রুত ধান কর্তনে খুব ভালো একটা নিয়ম বলে আমি মনে করি। এসময় তিনি বলেন, এবার মহামারি করোনায় সারাদেশে লকডাউন থাকলেও শ্রমিকদের আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি।