ঠিকাদারদের অমৃতবচন ‘এ কিছু না’ ও স্বাধীনতার ৪৫ বছর

পাগলার পালপাড়ায় একটু সেতু নির্মাণকালেই ভেঙে পড়েছে। ঠিকাদার বলেছেন, এ তেমন কিছু না। তিনি ভাঙা অংশ কোনভাবে বালি-সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দিতে চাইছেন। সেতুর ছাদ থেকে খসে পড়ছে আস্তরণ। ঠিকাদার বলছেন, এ কিছু না। মিছাখালি রাবারড্যামের একটি সেতু নির্মাণকালে ভেঙে পড়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়। তখনও ঠিকাদার বলেছিলেন, এ কিছু না। ঠিকাদারের সাথে সুর মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রকৌশলীও বলেছিলেন, এ কিছু না। বিশ্বম্ভরপুর-শক্তিয়ারখলা রাস্তায় নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার কালে সেগুলো আটকে দিয়েছিলেন স্থানীয় জনতা। কাজ বন্ধ ছিল কয়েকদিন। সেসময়ও ঠিকাদার বলেছিলেন, ও কিছু না। বিভিন্ন হাওরে বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করছেন ঠিকাদার ও পিআইসিরা। গণমাধ্যম খুঁটে খুঁটে বাঁধের কাজে গুরুতর অনিয়ম নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ করছেন। সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য ও চিত্রসহকারে প্রমাণসম্বলিত সংবাদ পরিবেশন করা হলেও ঠিকাদার ও পাউবো কর্তারা টিয়া পাখির মতো জপেই চলেছেন, ও কিছু না.. ও কিছু না..। এই ‘ও কিছু না’ থেকে রেহাই পাওয়ার কি কোনই পথ নেই?
ও কিছু না বা এ কিছু না সংস্কৃতির উৎস হলো বেপরোয়াত্ব, জবাবদিহিতার অভাব, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক প্রশ্রয়। কারণ যিনি বা যারা বলছেন ‘এ কিছু না’ তারা জেনেশুনেই এটি বলছেন যে কাজ খারাপ করলেও এমনকি কোন কাজ না করলেও বিলের টাকা ঠিকই ট্রেজারি থেকে উঠে যারা যার পকেটে ঢুকে যাবে। নাচার পাবলিক খেপে গিয়ে কিছু বললে একে উড়িয়ে দিলে তাদের লাভের গুড় পিপড়ায় খেয়ে নিতে পারবে না। এমন বেপরোয়াত্বের সংস্কৃতিতে ঠিকাদাররা এস্টিমেটের থোরাই কেয়ার করে ‘ছেপ দিয়ে লেপ ঢাকা’র মতো কাজ করবেন এ আর আশ্চর্য কি।
আজ বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের ৪৫ তম স্বাধীনতা দিবস। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তেরঞ্জিত স্বাধীন দেশটি এখন ৪৫ বছর বয়সের পরিণত। এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পরও সরকারি কাজে সীমাহীন লুটপাট আর অনিয়মের চিত্র যখন একেবারেই সাধারণ দৃশ্য তখন বলতে হয়ই, শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে ওই ‘এ কিছু না’ আওরানো সংখ্যাল্প গোষ্ঠীটিই। স্বাধীনতার আগে যেখানে একজন বাঙালি কোটিপতি দেখতে রীতিমতো ভিরমি খেতে হতো এখন সেখানে মাল্টি মিলিয়নিয়ার-বিলিয়নারদের ভিড়ে টেকা দায়। মিলিয়নার-বিলিয়নারদের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করার জন্য এই দেশ স্বাধীন হয়নি। এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল সকলের সুষম উন্নয়নের জন্য। কিন্তু দেখতে পাওয়াই যাচ্ছে এখন অব্ধি সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। সুতরাং ৪৫তম স্বাধীনতা দিবসে এই সুষম উন্নয়নের পথে দেশকে ফেরানোর অঙ্গিকার গ্রহণ করাটাও আজকের দিনের একটি বড় কর্তব্য।
দেশ পরিচালনা করেন রাজনীতিকরা। এইসময়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি ক্ষমতায়। পাকিস্তানি শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাগ্রত বাঙালির বিদ্রোহকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী নেতৃত্বে যে জাতীয়চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল একাত্তরে, আওয়ামী লীগের সেটি ভুলে থাকার কথা নয়। এই দলটি সময়ের চাইতে এগিয়ে অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে। এখন আরেকটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদেরকে। সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চেতনা শোষণহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের। এই চেতনার বাস্তবায়ন ঘটলে কোন ঠিকাদারের বুকের পাটা হবে না এটি বলার যে, ‘এ কিছু না’। কারণ তখন এটি বললে অনেক কিছু হয়ে তার মাথায় বজ্রাঘাত হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে। তাঁর এই দর্শন আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে।