ঠিক হয়নি এপ্রোচ, ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘কয়দিন আগে ব্রিজ থাইক্যা নামতে গিয়া টমটমের চাকা খুইল্যা যায়। ভাগ্য ভালা এই টমটমে কোন যাত্রী আছিল না। না হইলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত। ব্রিজের নীচের অংশ ভাঙ্গা থাকায় ঝাকরানিতে এমনডা হইছে। কোন সময় যে কী হইব বলা যায় না।’
জামালগঞ্জের সাচনা বাজার থেকে বেহেলী রোডে যাতায়াতকারী মোটরসাইকেল চালক মো. নবী হোসেন এ কথাগুলো বলছিলেন। তার সাথে সুর মিলিয়ে আরেক মোটরসাইকেল চালক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙ্গাডা আসলে ঝুঁকিপূর্ণই। অনেক দিন ধইরাই রাজাপুর ব্রিজের নামনের জায়গাডা ভাঙ্গা অবস্থায় আছে। ব্রিজ থাইক্যা নামতে হইলে খুব সাবধানে নামন লাগে। সবাই তো আসা-যাওয়া করে এই রাস্তা দিয়া। কিন্তু কেউই বিষয়ডা গুরুত্ব দিয়া দেখতাছেন না।’
জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামসংলগ্ন সেতুর ভাঙ্গা এপ্রোচ নিয়ে সুনামগঞ্জের খবর-এ একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বছর দেড়েক ধরে রাজাপুর সেতুর বেহেলী বাজারমুখী এপ্রোচটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও সংশ্লিষ্ট কারও নজরে আসছে না বিষয়টি। বারবার সংবাদ প্রকাশের পরও ঝুঁকিপূর্ণ এপ্রোচটিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চরম অবহেলা থাকায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন যানবাহন চালক, পথচারীসহ সাধারণ মানুষেরা।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজাপুর সেতুর বেহেলীমুখী এপ্রোচের বেশির ভাগ অংশই ভেঙ্গে হেলে পড়েছে। সেতু থেকে নামতে চরম ঝুঁকি পোহাচ্ছে যাত্রীবাহী যানবাহন। দিনের বেলায় সেতু থেকে ভাঙ্গনকৃত এপ্রোচ নজরে আসলেও সন্ধ্যা-রাতে সেটি তেমন চোখে পড়বে না। যেকোন সময় গাড়ি উল্টে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া সেতুর দক্ষিণ অংশেও ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। সেতুর উভয় পাশে তড়িত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
এছাড়া বেহেলী সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে সাঁটানো নির্দেশিকা বোর্ডের অধিকাংশই ভেঙ্গে মাটিতে মিশে গেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের কয়েক স্থানে নিরাপত্তা পিলারের ভেঙ্গে যাওয়া চিহ্নও চোখে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সওজ ও জনপ্রতিনিধিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করলেও ঝুঁকিপূর্ণ এসব বিষয় কারও নজরে আসছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী, বেহেলী আলীপুর, মশালঘাট, তিলকই, ইসলামপুর, শিবপুর, চ-ীপুর, প্রকাশনগর, রাধানগর, রহমতপুর, হরিনগর, পুটিয়া, বাগানী, কুমড়িয়া, রাজাপুর, চিনামারা, শলাচূড়া, বাগহাঁটি, রহিমাপুর, রহিমাপুর গুচ্ছগ্রাম, আরশিনগর, গোপালপুর, নিতাইপুর, বদরপুর, ইনাতনগর, জামালগড়, টাকাটুকিয়া, বীননগর, লক্ষ্মীপুর, উজান তাহিরপুর, ভাটি তাহিরপুরসহ অন্তত ৪০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম সাচনা বাজার-বেহেলী সংযোগগামী সড়কের রাজাপুর সেতু। বর্তমানে সেতুর এক অংশের সম্মুখস্থলে ভাঙ্গন দেখা দেওয়ায় হুমকির মধ্যে পড়েছে যাতায়াত।
সেতুসংলগ্ন রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মানিক লাল দাস জানিয়েছেন, সেতুর ভাঙ্গনকৃত এপ্রোসটা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। এ জায়গা দিয়ে চলাচল না পারতে করা হয়। এখান দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায় সময়ই ছোটখাটো এক্সিডেন্ট ঘটে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে বড় কিছু ঘটলে জীবন লইয়া টান দিব।
বেহেলী গ্রামের বাসিন্দা ও বেহেলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতি রঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, উপজেলা সদরে যেতে আমাদের একমাত্র রাস্তা এটি। এ সড়কের রাজাপুর ব্রিজের এপ্রোচ অনেক দিন ধরেই ভাঙ্গা অবস্থায় আছে। প্রায় সময়ই এখানে সিএনজি-অটোরিক্সা দুর্ঘটনার খবর মিলে। এ পথ দিয়ে প্রশাসনের লোকেরাও তো আসা-যাওয়া করেন। এখানে দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আছে বলে মনে হয় না। যদি দৃষ্টি থাকতো তাহলে এই এপ্রোচ এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে না।
বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের যে এডিপি বরাদ্দ আছে তা থেকে এপ্রোচের কাজ করা হবে। এপ্রোচ ঠিক করার জন্য ৪ লাখ টাকার প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। অচিরেই টেন্ডার হবে, কাজও শুরু হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, গত বন্যায় জামালগঞ্জের প্রধান কয়েকটি সড়ক মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো নিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত। বেহেলীর রাজাপুর সেতুর বিষয়টি নজরে থাকলেও কাজে হাত দেওয়া যাচ্ছে না। এর মাঝে এডিপি বরাদ্দের চার কিস্তির মাঝে পেয়েছেন মাত্র এক কিস্তি। যার জন্য এ স্কিমে হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। তবে এবার প্রথম কিস্তির টাকাতেই এইটা করে ফেলবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।