অনুকরণযোগ্য রাজনীতিক ডা. এম.এ. করিম ৯৮ বছর বয়সে বৃহষ্পতিবার দুপুরে মৃত্যুবরণ করেছেন। বাংলাদেশের গণমুখী রাজনৈতিক চর্চার জায়গায় এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। ডা. এম.এ. করিম ব্রিটিশ পরাধীন আমল হয়ে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে জনগণের মুক্তির জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন। বহু তারকা রাজনীতিকের বিচ্যুতি, পদস্খলন, ক্ষমতালোভ, সুবিধাবাদিতার উদাহরণ এই দীর্ঘসময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করলেও বিরল ব্যতিক্রম হিসাবে এর মাঝে মাথা উঁচু করিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডা. এম.এ. করিম। তিনি আমত্যু একটি শোষণ ও বৈষম্যহীন তথা সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রশ্নে আপোষহীন থেকেছেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন তাঁর। মাওলানা ভাসানীর সাহচর্যে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ গঠনের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন। কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের সান্নিধ্য লাভের পর সাম্যবাদে উজ্জীবীত হয়েছেন এবং এই লক্ষ্যেই অবিচল থেকেছেন। একটি পুরো জীবন লক্ষ্যে অবিচল থাকার মতো দৃঢ়তা দেখানোর এক সংগ্রামী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। সুতরাং তাঁর মৃত্যু মানে একটি গৌরবজনক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। প্রায় শত বছরের সংগ্রামী জীবনের অবসানে তিনি নিজের আদর্শবোধ জাগ্রত করে গেছেন আরও বহু প্রাণে। ওইসব আদর্শিক প্রাণের বিচরণের মধ্য দিয়েই চির ভাস্বর হয়ে থাকবেন গরিবের চিকিৎসক হিসাবে খ্যাত এই চিরসংগ্রামী মানুষটি।
উনিশ শ’ চল্লিশের দশকে দুর্ভিক্ষ, তৎপরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভৎসতা; এই দুই জায়গায়ই তরুণ করিম ছিলেন ভরসা ও প্রতিবাদের স্ফূরণ। দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে তিনি যেমন প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন তেমনি সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মানুষকে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে ছুটে গেছেন বিহারে-পাটনায়। চিকিৎসক হওয়ার পর মহান এই ব্রতকে তিনি কখনও পয়সা উপার্জনের উপাদানে পরিণত করেননি। বরং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে গণমুখী করতে সর্বদা নিয়োজিত থেকেছেন। আর নিজে চিকিৎসা দিয়েছেন নামমাত্র মূল্যে অথবা বিনা পয়সায়। মৃত্যুর আগে তিনি সংগতিবান লোকদের নিকট থেকে মাত্র ৫০ টাকা ফির বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, সংগতিহীনদের জন্য ছিলো না কোনো আর্থিক বিনিময়। তিনি রাজনৈতিক বিশ^াসের জায়গা থেকে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক সেবা। প্রকাশনার পর প্রায় ৪০ বছর ধরে এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা তথা গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে আদর্শিক সংগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে।
রাজনীতি এখন জনগণের নিকট থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। নীতি থেকেও যোজন যোজন দূরত্ব এর। ডা. করিমরা যখন চোখে স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন তখন একটা মহান আদর্শকে সামনে রেখে তাঁরা এসেছিলেন। তাঁদের ভিতর ছিলো তীব্র দেশপ্রেম, তাঁরা ছিলেন আদর্শবান, এইসব রাজনীতিক কখনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য নিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির চিন্তা করেননি। তাঁরা ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ কায়েমের চেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন । আজকের যুগে তাঁদের ওই আত্মত্যাগ কিংবা বীরত্বগাঁথা অনেকটা কল্পকথার মতো শোনালেও বাস্তবতা এটাই যে, সকলের জন্য সুন্দর দেশ বিনির্মাণে ওই আদর্শবাদী রাজনীতির বিকল্প নেই। তাই আমরা একজন করিমের মৃত্যুতে শোকে কাতর হই, তাঁকে স্মরণ করি, তাঁর প্রতি ভালবাসা দেখাই। কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের রাজনীতিকে সেরা নীতির জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।
মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা চিরন্তন। এই আকাক্সক্ষা ছিলো বলেই মানুষের সভ্যতা ক্রমশ এগিয়েছে। যুগে যুগে ডা. করিমের মতো লোকেরা আদর্শিক আলোর মশাল হাতে অন্ধকারকে বিদীর্ণ করেছেন। নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে পৃথিবী। আজ ডা. করিম লোকান্তরে চলে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন ওই আলো। আমরা যারা সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি তারা বারবার তাঁর আলোর স্পর্শে দীপ্যমান হয়ে উঠব। নিজেকে করে তোলব আলোর পথের যাত্রী। এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখে অনুসরণীয় ব্যক্তি ডা. এম. এ. করিমের অমর স্মৃতির প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।

