সরকার নতুন বাংলা সনের ১ বৈশাখ থেকে ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে আদায়ের নির্দেশনা জারি করেছেন। নির্দেশনা অনুসারে এখন থেকে নগদে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করার আর কোনো সুযোগ থাকছে না। নির্দিষ্ট পোর্টালে যেয়ে ভূমি মালিকদের জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে নিজের নাম নিবন্ধন করাতে হবে এবং পরে ভূমির তথ্য দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা নিজের দাপ্তরিক আইডি থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এর অনুমোদন দিবেন। ভূমি উন্নয়ন করের এমন ডিজিটাল করার ঘটনাটি ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। যেহেতু নগদে কর আদায়ের সুযোগ থাকছে না তাই এই ব্যবস্থাটি দ্রুতই কার্যকর হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ভূমি সংক্রান্ত অপরাপর ক্ষেত্রে যদিও প্রচলিত পদ্ধতি আপাতত বহাল থাকছে তবু অন্তত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করার ক্ষেত্রে নাগরিকগণ অযথা ভোগান্তি থেকে বাঁচতে পারবেন। ভূমি উন্নয়ন কর আদায় নিয়ে নয়-ছয় কর্মকান্ডেরও বিলুপ্তি ঘটবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনা একটি জটিল পদ্ধতি। অনেক সময় দূরভিসন্ধিমূলকভাবে সহজ বিষয়কেও জটিল করে ফেলা হয়। এর পিছনে ভূমি সংক্রান্ত নানা দপ্তরের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দুর্নাম সকলের নিকট প্রবাদ প্রসিদ্ধ বিষয়। ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে আদালতে যত মামলা হয় বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটে তা আর কোনো কিছু নিয়ে হতে দেখা যায় না। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বা নিজের অর্জিত ভূমির নিরঙ্কুশ ব্যবহারের ক্ষমতা সকলের আইনসিদ্ধ অধিকার। কিন্তু দুষ্ট লোকজনের নানা কিসিমের ছলচাতুরির কারণে মানুষের এই নিরঙ্কুশ অধিকার প্রায়শই বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার উদ্ভব ঘটে যা বছরের পর বছর চলতে চলতে সংশ্লিষ্টদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এইসব অঘটনের পিছনে একটা বড় কারণ হলো এই ব্যবস্থাপনার পিছনে জড়িত অসৎ ব্যক্তিবর্গ ও সাবেকি আমলের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। এখন আধুনিক যুগ। তথ্যপ্রযুক্তির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছে। সরকারি সেবাসমূহ জনগণ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পেতে আগ্রহী। কিন্তু বেসরকারি খাতে যত দ্রুত ডিজিটালাইজেশন ঘটছে তার তুলনায় সরকারি দপ্তরের অগ্রগতি একেবারে চিতাবাঘের তুলনায় হাতির মতো। সরকারের অনেক দায়িত্বশীল বহুবার বলেছেন, ভূমি সেক্টরের সকল সেবাই অনলাইনে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু কোথায় তা? মাত্রই আমরা ভূমি উন্নয়ন কর সংক্রান্ত ডিজিটাল সেবার একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পেলাম। বিশেষ করে ভূমি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতিটি ডিজিটাল না করার কারণে কতো ইচ্ছাকৃত অনিয়ম (অপরাধ) হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। ক্রেতা রেজিস্ট্রেশনের সময় রেজিস্ট্রেশন ফিস ইত্যাদির নামে যে টাকা দিয়ে থাকেন তার কত অংশ সরকারি খাতে জমা হয় আর কত অংশ নানাভাবে বিলিবণ্টন হয় তার হিসাব কেউ জানতে পারে না। ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসের এই সিক্রেট নাকি দুনিয়ার শক্তিধর গোয়েন্দারাও আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হবেন। অথচ অনায়াসে এই সেবাটিকে ডিজিটাল করা যেতে পারে। হচ্ছে না যে, এর পিছনে কিছু কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা আছে। তাদের উপেক্ষা করার মতো হিম্মত দেখিয়েই এই কাজটি করতে হবে।
ভ’ূমি উন্নয়ন করের মতো, নামজারি, নামখারিজ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ভূমি রেজিস্ট্রেশন, সেটেলম্যান্ট কার্যক্রমকে অবিলম্বে ডিজিটাল করার দাবি সারা দেশের মানুষের। মৌজাভিত্তিক সেটেলম্যান্ট নকসা যাতে যে কেউ অনলাইনে সংগ্রহ করতে পারেন সেজন্য এগুলো নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করে রাখা উচিৎ। আমাদের বিশ্বাস ভূমি সংক্রান্ত সেবাগুলোকে ডিজিটাল করা গেলে সামাজিক অপরাধ ও দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমে আসবে। আদালতগুলো এখন যে মোকদ্দমা-জটে পড়ে রয়েছে তারও অবসান ঘটবে। সাধারণ মানুষ নিজের সম্পদের নিরুদ্বেগ ও উৎপাতহীন ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে খুশি থাকবেন। তাই আমরা একদিকে ভূমি উন্নয়ন কর ডিজিটালাইজেশনের সফলতা যেমন কামনা করি তেমনি অন্যান্য সেবাগুলোরও দ্রুত ডিজিটালাইজেশন প্রত্যাশা করি।


