ডুবন্ত বাঁধের বিল আটকানো ন্যায়বিচারের অংশ

ডুবন্ত বাঁধের বিল পরিশোধ না করার জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত আবেদন করেছেন হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন নামক নতুন একটি সংগঠন। এ বছরের ভয়াবহ হাওর দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে বাঁধ ভেঙ্গে ও অকাল বন্যায় অত্রাঞ্চলের প্রধান ফসল হানির প্রতিবাদে এই সংগঠনটি গড়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে সংগঠনের উদ্যোগে বেশকিছু প্রতিবাদী কর্মসূচী পালিত হয়েছে যা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সংগঠনটির ডুবন্ত বাঁধের বিল পরিশোধ না করার আবেদনপত্রটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং জনগণ বাঁধ নির্মাণে যে বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন সে আলোকে অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ। যদিও জেলা প্রশাসক এরূপ বিল আটকানোর ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন কিনা আমরা জানি না তবুও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই এই আবেদনের বিষয়টি ইতোমধ্যে অবহিত হয়েছেন। শুধু বিল আটকানো নয়, বাঁধ নির্মাণ না করা, যথেচ্ছভাবে কাজ করানো এবং পানির প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ হওয়া বাঁধগুলোর ঠিকাদার ও পিআইসি এবং অবশ্যই পাউবো প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জেলার বিভিন্ন জায়গায় এই দাবিতে কৃষকরা ফুঁসে উঠছেন। প্রতিদিন তৃণমূলে প্রতিবাদ কর্মসূচী হচ্ছে। যদিও এখন এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে তবে মনে করার কারণ নেই যে, এই বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ-বিক্ষোভগুলো স্থায়িত্ব পাবে না। এবার ছোট থেকে মাঝারী ও বড় কৃষক সকলেই ফসল হানির শিকার হয়েছেন। এদের অনেকেই নানা রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্কিত। নেতাতুষ্টিতে এদের অনেককেই বিগলিত হতে দেখেছি আমরা। একেবারে ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের প্রচার উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনেও উৎসাহী থাকতেন কেউ কেউ।  সামাজিক গণমাধ্যমে আমরা দেখছি যারা এতদিন রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন ব্যক্তির অন্ধ সমর্থনে নিয়োজিত ছিলেন এবার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনিই হাওর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। সুতরাং সর্বস্ব হারানো কৃষকদের ক্ষোভকে হালকা করে দেখার কোন উপায় নেই।
এবার যদি কোন দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার বা পিআইসির বিল বিনা তদন্তে পরিশোধ করা হয় তাহলে কৃষকের সাথে প্রতারণা করা হবে। আওয়াজ উঠেছে ঠিকাদার-পিআইসির নিকট থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের। হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন নামক সংগঠনের দায়িত্বশীলরা যখন কৃষক সমাজের কণ্ঠ হয়ে বিল আটকানোর দাবি তুলেছেন তখন অবশ্যই সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বছর বছর হাওর দুর্নীতির অবসানের লক্ষে যে জাতীয় ঐক্য (আঞ্চলিক পর্যায়ে) গড়ে উঠেছে সেটিকে অগ্রাহ্য করা সরকারের জন্য হবে আত্মঘাতি। সরকার যদি এবারের ফসলহানির পিছনে ব্যক্তিবিশেষের কারচুপিকে অগ্রাহ্য করেন তাহলে কৃষক সমাজের ক্ষোভ-বিক্ষোভটি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে চলে যাবে। সরকার কেন এই দায়িত্ব নিতে যাবে? যদিও দুর্নীতির দায় সরকার অস্বীকার করতে পারবে না কীছুতেই। সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অংশের কিয়দংশ প্রত্যক্ষভাবেই এই দুর্নীতির কুশীলব। সরকারের উচ্চ পর্যায়কে এখন প্রমাণ করতে হবে শরীরের পঁচন ধরা অংশকে রেখে দিবেন নাকি অপসারণ করবেন।
প্রচলিত রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হলো শহরমুখী তৎপরতা। গ্রামে এ সবের ঢেউ লাগে কমই। এবার গ্রাম ফুঁসে উঠেছে। পেটে লাথি পড়ায় দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে এই সব হারানো দলের সামনে এগোনো ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই। আসুন যে যেখানে আছেন এই বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াই। যে রেকম পারি সহায়তা করি। ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিপক্ষে মানুষের অবস্থান চিরন্তন ও ধ্রুব।  মানুষের ইতিহাসের এই বৈশিষ্ট্য আবার আপন ঐতিহ্যে উদ্ভাসিত হয়েছে।