ডুবল জামালগঞ্জের হালির হাওর- কৃষকরা বললেন পিআইসি দায়ী

বিন্দু তালুকদার ও আকবর হোসেন
চার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)’র অনিয়ম-দুর্র্নীতির কারণেই জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী, জামালগঞ্জ উত্তর ও তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ৯ হাজার হেক্টর বোরো জমির হালীর হাওর ডুবেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কালীবাড়ি বাঁধের চার পিআইসির সভাপতি হলেন, বেহেলী ইউপির ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য মনু মিয়া, ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য আবু সুফিয়ান, সংরক্ষিত ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রাশিদা আক্তার ও ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অজিত রায়।
রবিবার রাতে হালীর হাওরের কালীবাড়ির বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে। এদিকে হালীর হাওরের বাঁধ রক্ষায় এলাকার হাজার কৃষক আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পিআইসি’র লোকজন এলাকা  
 ছেড়ে দিয়েছিল বলে কৃষকদের অভিযোগ।
বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার কালীবাড়ি বাঁধের পিআইসি সভাপতিদের তাগিদ না দিয়ে ও হাওরের বাঁধ নির্মাণের তদারকি ফেলে যুবলীগের কমিটি আনতে রাজধানী শহরে অবস্থান করছিলেন বলে অভিযোগ করছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।
স্থানীয় ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, হালীর হাওরের কালীবাড়ি বাঁধ নির্মাণে প্রথমে দুইটি পিআইসি গঠন করা হয়। একটির সভাপতি ইউপি সদস্য মনু মিয়া ও অন্যটির সভাপতি ইউপি সদস্য আবু সুফিয়ান। প্রথমে দুইটি প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয় ২৮ লাখ টাকা। পরে এই বাঁধের বরাদ্দ আরও ২২ লাখ বৃদ্ধি করতে নতুন করে আরো দুইটি পিআইসি গঠন করা হয়। একটির সভাপতি করা হয় ইউপি সদস্যা রাশিদা আক্তার ও অন্যটির সভাপতি অজিত কুমার রায়কে।
একাধিক কৃষকরে অভিযোগ প্রকল্প বরাদ্দ ২২ লাখ বৃদ্ধি করে ৪৬ লাখে উন্নীত করলেও সময়মত কাজ শুরু করা হয়নি। মার্চ মাসে বাঁধের কাজ শুরু করা হয়। শুরু থেকেই বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে পিআইসির সভাপতিদের বিরুদ্ধে। কাগজে কলমে ইউপি সদস্যরা চারটি পিআইসির সভাপতি থাকলেও বাস্তবে সবগুলো প্রকল্পে কাজ করেছেন বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার। তিনি ইচ্ছাখুশি ও দায়সারাভাবে বাঁধের কাজ করেছেন। ইউপি সদস্যরা শুধু কাগজে কলমেই দায়িত্ব পালন করেছেন।   
হালীর হাওর পাড়ের স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ কালীবাড়ি বাঁধের কাজ সঠিক সময়ে শুরু হয়নি ও সঠিকভাবে হয়নি। প্রকল্পের নামে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বার ও এসও মিলে লুটপাট করেছে। যদি বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হত তাহলে এত সহজে বাঁধ ভেঙে যেত না।
বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল হক মনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন,‘ আমাদের একমাত্র বোরো ফসলের হালীর হাওরের বাঁধ নিয়ে যখন চরম ঝুঁকি দেখা দেয় তখন চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার যুবলীগের কমিটি আনতে ঢাকায় হোটেলে বসে দিন কাটিয়েছেন। ফেইসবুকে একের পর এক ছবি দিয়েছেন। বাঁধের কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরাদ্দ লুটপাট হয়েছে। বাঁধ যখন ঝুঁকিতে পড়েছে তখন এলাকার ধনী-গরীব সকল কৃষক দিনরাত মাটি কেটেছে। কিন্তু সময়মত মাটি না দেয়ার কারণেই দুর্বল বাঁধ অসময়ে ভেঙেছে।’
জামালগঞ্জ উত্তর ইউপির কালীপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কলমধর বলেন,‘ নিয়ম অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সঠিক সময় ও সঠিকভাবে কাজ হয়নি। তাই দুর্বল বাঁধ সহজেই পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। কারণ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে হাওরের বাঁধ নির্মাণ করলে অবশ্যই এসব বাঁধ অনেক শক্ত ও মজবুত হত, খুব সহজেই এভাবে ভেঙে যেতো না।’
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন,‘ ওয়াপদা (পানি উন্নয়ন বোর্ড) এর সকল কাজই হলো অনিয়ম আর দুর্নীতি। তাদের এমন কোন কাজ নেই যেখানে দুর্নীতি হয় না। বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অকালে হাওরের ফসল ডুবির ঘটনা বার বার ঘটে। সময় এসেছে এবং সারা এলাকাবাসীর দাবি সকল অনিয়ম-দুর্নীতির গণতদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
এ ব্যাপারে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদারের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।
হালীর হাওরের কালীবাড়ি বাঁধের চার পিআইসির পক্ষে এক পিআইসি সভাপতি ইউপি সদস্য মনু মিয়া বলেন,‘ চেয়ারম্যান ও আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। কাজ বেশী বরাদ্দ কম তাই আমরা দুই পিআইসির সভাপতি বাঁধের কাজ করতে রাজী ছিলাম না। পরে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও নতুন দুইটি পিআইসি দেয়া হয়েছে। গত মার্চ মার্সের ১৪ তারিখ আমাদের সাইট বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। শুরু থেকেই বরাদ্দ প্রদানে ছিল পাউবোর গড়িমসি। আমরা কাজ করেছি ৪০-৪৫ লাখ টাকার, আর পেয়েছি মাত্র ২৮ লাখ টাকা। বাকী টাকা এখনও পাইনি। ইউপি সদস্য রাশিদা ও অজিত রায় কাজ করতে এবং পিআইসির সভাপতি হতে রাজী ছিলেন না। পরে চেয়ারম্যান সাহস দেয়ায় ও নিজে কাজের দায়িত্ব নেয়ায় তারা রাজী হন। কাজ চলার সময়ে চেয়ারম্যান নানাভাবে আমাদের টাকা ধারে এনে দিয়েছেন। পরে আমরা বিল তুলে চেয়ারম্যানের হাতে দিয়েছি। আমরা প্রকল্পের নিয়মের বাইরে ৬০ ফুটের স্থলে ১২০ ফুট প্রস্ত করে কাজ করেছি। আমাদের কাজে কোন ধরনের গাফিলতি ছিল না। আমাদের ও এলাকার কৃষকদের কপাল খারাপ তাই রবিবার রাতে ঝড় তুফানে ঢেউ উঠলে বাঁধ উপচে পানি ঢুকে এক পর্যায়ে বাঁধ ভেঙে যায়। ’
হালীর হাওরের পাউবোর তদারককারী কর্মকর্তা উপ সহকারি প্রকৌশলী (এসও) আলী রেজার সাথে কথা বলতে চাইলে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি। পরে এক পর্যায়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রসূন কুমার চক্রবর্তী বলেন,‘ হালীর হাওরের কালী বাড়ি বাঁধ নির্মাণে শুরু থেকে ব্যাপক অভিযোগ ছিল, সঠিক সময়ে ও সঠিকভাবে কাজ হচ্ছে না। যেহেতু এলাকাবাসী ও কৃষকদের কাছ থেকে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ’