তাদেরও বিচারের সময় এসেছে: প্রধানমন্ত্রী

সু.খবর ডেস্ক
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার অঙ্গিকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী, গণহত্যাকারী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের যারা লালন-পালন ও মদদ দিয়েছে, লাখো শহীদের রক্তরঞ্জিত জাতীয় পতাকা তাদের হাতে তুলে দিয়েছে- তারাও সমান অপরাধী। তাই যুদ্ধাপরাধীদের পাশাপাশি এদের মদদদাতাদের বিচার হতে হবে। আজ সময় এসেছে তাদেরও বিচার করার; এই অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবার।
বিএনপির উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, পঁচাত্তরে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১০ বছর বলতে গেলে কারফিউ দিয়ে দেশ চালানো হয়েছে। যারা কারফিউ দিয়ে দেশ চালিয়েছে, তাদের মুখেই আজ গণতন্ত্রের বুলি।
বুধবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, চলতেই থাকবে। কোনো অপশক্তিই এ বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। কেন না এটি ন্যায় ও সত্যের পথ। ন্যায় ও সত্যের পথের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের ঘাতকদের যারা লালন-পালন করেছেন, তাদের বিচারও এই বাংলার মাটিতে শুরু করতে হবে।  
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না, বৃথা যেতে দেব না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, তারাই ব্যর্থ হয়েছে। আমরা দেশকে উন্নয়নের পথে ধাবিত করে তা প্রমাণ করেছি। মাঝখানে কিছু কালো মেঘ এসেছিল। আর কখনো যাতে এই কালো মেঘের ঘনঘটা না আসে, আর যাতে জনগণের ভাগ্যে নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে- জনগণকে এ ব্যাপারে সোচ্চার ও মোকাবেলা করতে হবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে দেশকে গড়ে তুলবোই। এদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে তুলে শহীদ বৃদ্ধিজীবীসহ একাত্তরের সব শহীদের রক্তের ঋণ আমাদের শোধ করতে হবে।
বক্তব্যের শুরুতে শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ একাত্তরের সব শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মধ্যে কিছু বেঈমানের জন্ম ও এদেশিয় আলবদর-আলশামস সৃষ্টি না হলে কোনোভাবেই এত বুদ্ধিজীবী হত্যা করা সম্ভব হতো না। আলবদর-আলশামসরাই তালিকা তৈরি করে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করতে সাহায্য করেছে। কী বীভৎস্য কায়দায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও স্বজন হারানোর বেদনা তুলে ধরে আবেগজড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরের শত্রুরা তাদের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। দেশ স্বাধীনের পরও তাদের ষড়যন্ত্র বন্ধ থাকেনি। তাই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে। আমার এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, যে বাঙালির জন্য, বঙ্গবন্ধু সারাজীবন এত কষ্ট সহ্য করলেন, দেশ স্বাধীন করলেন- সেই বাঙালি কীভাবে তার বুকে গুলি চালালো! আজও বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির দোতলার সিঁড়ির কাছে গিয়ে বসি।
বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাঙালি জাতির ইতিহাসই পাল্টে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানান। বিচার বন্ধ করে দিয়ে কারাবন্দি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। নিষিদ্ধ থাকা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চালু ও যুদ্ধাপরাধীদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশকে উল্টে দিকে পরিচালিত করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর একটি প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের  সঠিক ইতিহাস জানতে দেওয়া হয়নি। সে সময় ‘পাকিস্তানি হানাদার’ বাহিনী বলা যেতো না। বলতে হতো শুধু হানাদার। কিন্তু কারা সেই হানাদার, বলার সুযোগ ছিল না। জয়বাংলা স্লোগান এবং বঙ্গবন্ধুর নাম ও তার ভাষণও প্রচার করা যেতো না। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়েও মুখ ফুটে কিছু বলা যেতো না। একটি জাতি যখন ইতিহাস ভুলে যায়, তখন সে জাতি সামনে এগোবে কী করে?
জিয়াউর রহমানকে ইঙ্গিত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কিছু কথিত বুদ্ধিজীবী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীকে গণতন্ত্রের প্রবক্তা বানাতে উঠে পড়ে লেগেছিল। এরাই পেছন থেকে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিলেন। কেউ সত্যিকারের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হন কিংবা ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দেন, তিনি কীভাবে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানাতে পারেন? কেউ স্বাধীনতায় ভূমিকা রেখে থাকলে, কী করে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হয়ে যারা জাতিসংঘে অভিযোগ নিয়ে গেছেন- তাদের ক্ষমতার অংশ করতে পারেন?  
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে হত্যার জন্য বারবার হামলা হয়েছে। আল্লাহ আর দলের নেতাকর্মীদের জন্যই আমি প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। মানবঢাল রচনা করে নিজের জীবন দিয়ে নেতাকর্মীরা আমাকে রক্ষা করেছেন। শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে অনেকে সাহসী হয়ে সামরিক স্বৈরাচারসহ সব অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছি। কেন না সবাই বিকিয়ে যায় না। সবাই বিকিয়ে গেলে বাংলাদেশ এতো উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারত না। স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরে পাক হানাদারদের মতোই বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে গণহত্যা, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া ও মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে অপমান করা হয়েছে। যারা জাতীয় পতাকাকে অপমান করেছে তাদেরও একদিন বিচার হবে। এরা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে সে দল ক্ষমতায় এলে দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ হয় আমরা তা প্রমাণ করেছি। আর যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারা ক্ষমতায় এলে দেশ যে পিছিয়ে যায়- সেটিও দেশবাসী দেখেছে। তাদের ক্ষমতা মানেই ছিল ভোগ করা। কিন্তু ক্ষমতা মানেই ভোগ করা নয়, জনগণের কল্যাণ করা। মানুষ যেন উন্নত জীবন পায়, দেশ যেন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়- সেটিই হচ্ছে ক্ষমতা। আমাদের একটিই দায়িত্ব, দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতেই হবে। কেন না আমরা যুদ্ধ করে বিজয়ী জাতি।