তাহিরপুরের জলাশয়ে মাছের আকাল

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
জেলার সর্ববৃহৎ জলাভূমির হাওর টাঙ্গুয়াসহ ২৩টি ছোট বড় হাওর নদীনালা, খালবিল ও জলাশয়ের উপজেলা তাহিরপুর। মাছের ভরা মৌসুমেও তাহিরপুরে চলছে মাছের আকাল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ও হাওর,নদী, খাল-বিল জলাশয়গুলোর গভীরতা কমে যাওয়ায় গ্রীষ্মের শেষ বর্ষার শুরুতেও সেগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি আসেনি। ফলে এ অঞ্চলের হাওর, খাল-বিল, নদী ও জলাশয়সহ মুক্ত জলাশয়গুলো মাছশূন্য হয়ে পড়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আমাদের দেশে উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি মিঠা পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে বর্তমানে টেংরা, ফলিয়া, ভেদা, শিং, কৈ, মাগুর, বালিয়া, শৈল, গজাড়, টাকি, বোয়াল, খলিশা, চেলাাপুটি, বাঁশপাতা, বাইম, বাগাইসহ  ৫৪ প্রজাতির মাছ অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। বর্তমানে এ সমস্ত মাছ যাও কিছু আছে আগামী ১ দশক পর হয়ত তাও আর চোখে পড়বে না, এমনটাই আশঙ্কা অভিজ্ঞ মৎস্যজীবী মহলের। ইতোমধ্যে এ অঞ্চল থেকে নানীদ, মহাশোল, মনফর, চিতল, বাঁচা, গারুয়া, চিরাইন, রিটা, আইড়, পাবদা, গাংমাগুরসহ প্রায় ১৫ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে ।
তাহিরপুর উপজেলার জলাশয়গুলোর মধ্যে মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের বিশাল জলাভূমি মাছের অভয়াশ্রম টাঙ্গুয়া হাওরে রয়েছে ৯হাজার ৭শ ৭১ হেক্টর জলাভূমি। সেই সাথে শনি, মাটিয়ান, বলদা, কানামুইয়্যা ও হাসমারা সহ রয়েছে আরো ৮হাজার ৩শ ২৪ হেক্টর জলাভূমি। বেসরকারি ছোট বড় পুকুর রয়েছে প্রায় ৫শর মতো। এক সময় উপজেলার নোয়ানগর, সাহেবনগর, সুলেমানপুর, আনন্দনগর, লতিবপুর, ছিলানি তাহিরপুর, দুমাল, রামসিংহপুর, জাঞ্জাইল, মানিকখিলা, লামাগাঁও, রতনশ্রী, গোবিন্দশ্রী, শ্রীপুর উমেদপুর, কাউকান্দি, বড়দল, জামালগড়, জামলাবাজ, ইন্দ্রপুর, মধ্য তাহিরপুর, ভাটি তাহিরপুর, বীরনগর, উজান তাহিরপুর, জগদিসপুর গ্রামের জেলে পরিবারগুলো বিভিন্ন হাওর, খাল-বিল ও জলাভূমিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে  জলাশয়গুলো মাছশূন্য হয়ে পড়ায় তারা জীবন-জীবিকার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। এখনও পূর্বপুরুষের পেশা হিসাবে যারা  এ পেশাকে ধরে রেখেছে তারা অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। এলাকার হাট-বাজারগুলোতে মাছের আমদানি একেবারেই কমে গেছে। বাজারে যাওবা কিছু  
দেশীয় প্রজাতির মাছ আমদানি হচ্ছে তার দাম অত্যন্ত চড়া হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। বর্তমানে পবিত্র রমজান মাসে উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের মাছ পাওয়া গেলেও তার কোন স্বাদ নেই।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, পুষ্টির উৎস হিসাবে মাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দেহ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভিটামিন-এ, ক্যালসিয়াম এবং আয়রন মাছ থেকে পাওয়া যায়। আগে বাংলাদেশের মানুষের শরীরের প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৮০ ভাগ আসতো দেশীয় মাছ থেকে। এক সময় মাছ ভাতই ছিল বাঙালির প্রধান খাদ্য। আর এ খাদ্য সংস্কৃতিতেই রচিত হয়েছিল বিখ্যাত প্রবাদ বাক্য ‘মাছে ভাতে বাঙালি।’ আজ থেকে দু’দশক আগেও এ এলাকায়  মাছের কোন ঘাটতি ছিল না। হাওর,নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাভূমিতে মাছের এতই আধিক্য ছিল যে, মাছের জন্য পানিতে নৌকা বেয়ে যাওয়া যেত না।লাফিয়ে নৌকাতে মাছ উঠে যেত।
বর্তমানে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, হাওর নদীর নাব্যতা হ্রাস, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী নদীগুলোর মধ্যে বালি ও পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় বিলগুলোর গভীরতা হ্রাসের কারণে শুকিয়ে যাওয়া, গর্ত-ডোবাগুলো মাটি ভরাট করা, মা মাছের আবাসস্থল ডোবা-নালা-গর্ত ইত্যাদি সেচে মাছ ধরা, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন কাজে অপরিমিতভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, নানাভাবে জলাশয় দূষণ, মাছ ধরতে কারেন্ট জালের ব্যবহার, বিল সেচে মাছ ধরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদি। এ সমস্ত কারণে প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে।
উপজেলার ইন্দ্রপুর গ্রামের সুশীল বর্মন, লামাগাঁও গ্রামের আব্দুল কাইয্যুম, আনন্দ নগর গ্রামের মিজানুর, উমেদপুর গ্রামের সুনাপরান, রাজধরপুর গ্রামের হাদিছনূর, উমেদপুর গ্রামের আলীনূর বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকারি বিলগুলো প্রকৃত মৎস্যজীবীরা ইজারা পায় না। এক শ্রেণীর প্রভাবশালী লোকজন মৎস্যজীবী সেজে বিল-হাওর ইজারা নেয়ার কারণে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। অধিক লাভের আশায় এসব জলাশয়ে দেশি মাছের পরিবর্তে বিদেশি হাইব্রিড জাতের মাছ চাষ করছে। তারা উৎপাদিত মাছ অধিক মুনাফা লাভের আশায় স্থানীয় বাজারে বিক্রি না করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে  বিক্রি করে। ফলে স্থানীয় হাট-বাজারে মাছের দেখা মেলে না।
সচেতন মহল মনে করেন, দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় উন্মুক্ত জলাশয়গুলো প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কাছে ইজারা দিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করলে, ডিমওয়ালা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ, কারেন্ট ও কুনা জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং মৎস্যবিভাগ সরেজমিনে তদারকির ব্যবস্থা করলে মাছের উৎপাদন পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই স্বাাভাবিক করা সম্ভব।