তাহিরপুরের যাদুকাটার পাড়ে বসন্ত এসে দোলা দিচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
কেউ বা বন্ধুর হাতে হাত ধরে, খোঁপায় লাল রঙয়ের শিমূল ফুল রাঙিয়ে গাইছেন ‘আহা আজি এই বসন্তে, এতো ফুল ফোটে, এতো বাঁশি বাজে, এতো পাখি গায়।’
আবার কেউ নববিবাহিত স্বামীর হাত ধরে শিমুল তলায় হাঁটতে হাঁটতে একজন আরেকজনকে বলছেন ‘বসন্ত আজ আসলো ধরায়, ফুল ফুটেছে বনে বনে, শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায় ফাল্গুনী মোর মন বনে।’
সুনামগঞ্জ সীমান্তে মেঘালয় পাহাড়ের কূল ঘেষে, পাহাড়ী নদী যাদুকাটার পাড়ে এখন এভাবেই বসন্ত এসে দোলা দিচ্ছে।
অপরূপ প্রাকৃতির সৌন্দর্যকে আরো বিশেষায়িত করেছে বিশাল শিমুল বাগান। বিশাল অংশজুড়ে চতুর্দিকে রক্তরাঙা লাল ফুল। বসন্তের আগমন জানান দিচ্ছে, ফুলে ফুলে ভরে গেছে শিমুল বাগান।
সবুজের ডালে ডালে রক্ত লালের নাচন, শতকোটি শিমুল ফুলের রাজত্ব, এ যেনো এক স্বপ্নপূর্তি স্বর্গরাজ্য।
ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড় থেকে জাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ জলধারার উপর দিয়ে বসন্তের হাওয়া যেন শিমূল বাগানে এসে দোলা দিচ্ছে।
পাহাড়ি নদী জাদুকাটার তীর জুড়ে এখন রাশি রাশি মুগ্ধতা। রক্তরাঙা শিমুলের অগ্রিম বাসন্তি অভিবাদন জানাচ্ছে সবাইকে। ফাগুনের প্রকৃতির এই আগুনের সূত্রপাত বুঝি তাহিরপুরের এই শিমুলবাগান থেকেই। রূপের সেই আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। কুঁড়িয়েছে হাজারো সৌন্দর্য্য উপভোগকারীর মন।
গাছ ভর্তি রক্তে রাঙানো লাল ফুলের সৌরভ না থাকলেও মায়ায় কোনো কমতি নেই। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষগুলো যেনো সেই মায়ার জালে আটকা পড়েছেন।
সিলেট থেকে শনিবার এসেছেন সদ্য বিবাহিতা দম্পত্তি প্রিয়াংকা ও সিয়াম চৌধুরী। বললেন, কি যে ভালো লাগছে ভাষায় বুঝানো যাবে না, যাদুকাটার তীরের এই শিমুল বাগান যেন বসন্তের দূত। রক্তে রাঙানো শিমূল বাগান, সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ জলধারা সবকিছুই মায়াময়। ¯েœহ মমতায় মনটাকে ওখানে আঁকরে রাখতে চায় প্রকৃতি।
জামালগঞ্জের ইশতিয়াক আহমেদ শাওন বললেন, টকটকে লাল ফুল দেখে ছন্নছাড়া মানুষও প্রেমিক হয়ে যায়।
রাজধানী ঢাকা থেকে নীলা আক্তার, পাভেল চৌধুরী, রংপুরের আয়েশা সিদ্দিকা ও রণি আহমদসহ তাদের একদল বন্ধু একসঙ্গে এসেছেন।
নীলা আক্তার বললেন, ফাগুনের সকল আগুন ওখানে মিশে গেছে। সবগুলো গাছেই ফুল ফুটতে শুরু করেছে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়, বড়গোপটিলা ও রূপের নদী যাদুকাটার সমন্বয়ে অসাধারণ দৃশ্য। এখানে এসে মন ভরে গেছে।
শিমূল বাগানের মাথার উপরে ফুটে থাকা ফুল ঝড়ে পড়ে লাল গালিচা হয়েছে। অতিথিদের লাল গালিচার অপার সৌন্দর্যের সা¤্রাজ্যে স্বাগত জানায় ফুল বিক্রেতা, ঘোড়া চালক ও ছবিয়ালরা। লাল গালিচার ফুল কুঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে মালা, বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। রূপকথার ঘোড়ার পিঠে ছড়ে দর্শনার্থীরা লাল গালিচায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে আয়ের পথ তৈরি হয়েছে ঘোড়ার মালিক ও ছবিয়ালদের।
ঘোড়া চালক মো. আলী রাজ। চার ভাই বোনের সংসার। ঘোড়া চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়েই সংসার চলে তার। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে ঘোড়ার নাম রেখেছেন সেলিম রাজ। সেলিম রাজ দৌঁড়াতে পারে, পণ্যবাহী গাড়িও টানতে পারে।
আলী রাজের দম্ভোক্তি ‘আলী রাজ যা বলবে- সেলিম রাজ তাই শুনবে।’
শিমুল বাগানে ফুল ফোটা শুরু হতেই এখানে আগমন ঘটেছে আলী রাজের সঙ্গে সেলিম রাজের। আগে বড়গোপটিলায় ছিলেন এরা। সেখানে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫শ টাকা আয় করা গেছে। এখানে হাজার বারশ’ টাকা আয় করা যায়। এই আয় প্রতিদিনই বাড়ছে, জানালেন আলী রাজ।
বিন্নাকুলি গ্রামের বাসিন্দা ছবিয়াল মো. মঈনুল ইসলাম। সারাদিন শিমুল বাগানেই ক্যামেরা ক্লিক করছে সে। দর্শনার্থীদের ছবি তুলে সারাদিন ব্যস্ত সময় যাচ্ছে তার। ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে নিঁখুত ছবিতে ৫ টাকা করে নেয় দর্শনার্র্থীদের কাছ থেকে সে।
মঈনুল বললেন, প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয় তার। আর কয়েকদিন পরে আয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। মানিগাঁও গ্রামের ঘোড়া চালক মো. সুজন। তার ঘোড়ার নাম দিয়েছে জিং সিং পাওয়ার হ্যাস।
সুজন বললো, দুয়েক দিন হয় বুঝা যাচ্ছে বসন্ত এসেছে, দর্শনার্থী বাড়তে শুরু হয়েছে, আয়ও বাড়ছে। এই মৌসুমে দিনে ৮-১০ হাজার টাকাও আয় হয়।
জাদুকাটার নদীর তীরে ১০০ বিঘারও বেশি জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই শিমুল বাগান। শীতের বিদায়ের এই সময়ে, এক সঙ্গে তিন হাজার গাছ পাপড়ি মেলে আহ্বান করছে বসন্তকে। একদিকে রক্তিম ফুলের আভা, অন্যদিকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ।
সৌন্দর্যের এই স্বর্গরাজ্যের শুরুটা আজ থেকে উনিশ বছর আগে। ২০০৩ সালে উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদেও প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন গড়ে তুলেন এই শিমুল বাগান। তিনি না থাকলেও থেমে নেই সৌন্দর্য্য প্রিয় মানুষটির স্বপ্ন।
প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন বললেন, এলাকাটিকে আরও আকর্ষণীয় করার জন্য আমরা প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও ওয়াসব্লক করার উদ্যোগ নিয়েছি। পর্যটকরা যাতে কোন রকমের হয়রানির শিকার না হয় সেই বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখছি আমরা।